প্রেমের খামে


ভালোবাসার অর্ধাঙ্গিনী,

বহুদিন বাদে চিঠি লিখতে বসলে যেমন অনুভূতি হওয়ার কথা, তেমনটাই হচ্ছে এখন। একটা শূন্যতার মাঝে ছিলাম। একে অনুভূতির শূন্যতা বলে। প্রথম প্রেমের ধারাপাতে শূন্য নামের সংখ্যাই তো চিনে গেলাম। কিন্তু প্রকৃত প্রেমের আগমনে সেই শূন্য বাড়ছেই, তবে সেসবের আগে একটি 'এক' যুক্ত হয়ে শূন্যগুলোকে অর্থবহ করে তুলছে। সেই প্রকৃত প্রেম আমাকে আমার অস্তিত্ব চিনিয়েছে। সেই প্রেম আমাকে নতুনভাবে বাঁচতে শিখিয়েছে। সেই প্রেম আমাকে দূর ভবিষ্যত নিয়ে কিছুটা হলেও সচেতন হতে শিখিয়েছে।

কিন্তু আজও আমি এমন চিঠি তোমায় হয়ত লিখে ওঠতে পারিনি, যে চিঠিটা আগাগোড়া প্রেমময় বর্ণনায় ভরপুর। গভীর অনুভব নিয়ে কবিতা হয়ত উপলব্ধি করা হয়ে ওঠে না, কিন্তু তবুও অন্য সকলের কবিতা তো অনুভব করে যেতে পারি। সেসবের অনুভবের সাথে নিজের বুকের অনুভবগুলো মিলিয়ে নিতে চেষ্টাও করি। কিন্তু সেসবের মত করে লিখতেও যেমন পারি না, তেমনি সাবলীল গদ্যকেও প্রেমের পরশে সাজিয়ে তুলতে পারি না।

আমার চিঠির প্রেমময় অংশগুলো হলো যৌনতার অংশ। যৌনতা তো যে কেউ নিজের লেখার মাঝে নিয়ে আনতে পারে। আমি কি পর্নোগ্রাফি লেখক হয়ে গেলাম তাহলে? যৌনতা অবশ্যই প্রেমের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, তবে একমাত্র নয়। তাহলে চিঠির মাঝে নিয়ে আনা প্রেমময়তার অংশটিকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করব?

প্রেয়সীকে দেখলে বুকের ভেতরে যে এক দারুণ সুখানুভূতি জেগে ওঠে, তার সাথে আলাপকালে সমস্ত তনুমনে যে এক আনন্দের লহরী রক্তপ্রবাহের মত বয়ে যেতে থাকে, তাকে বারবার 'ভালোবাসি' বলে যাওয়ার মাঝে যে এক দারুণ তৃপ্তি অনুভব করা যায়; সেগুলোর কাব্যিক বহিপ্রকাশই তো প্রেমময়তা। সেগুলো কি আমি আনতে পারছি বা পেরেছি আমার চিঠিগুলোয়? মনে হয় না। পারিনি তো।

এই না পারাটাই আমাকে ব্যথিত করছে। আমি কষ্ট পাচ্ছি। আমার বুকের রক্তক্ষরণ কলমের কালি হয়ে বেরিয়ে আসতে পারছে না। তুমি আমাকে ভালোবাসো, আমিও তোমাকে ভালোবাসি। আমরা দু'জনই প্রতিদিন-প্রতিরাতে এ কথার স্বীকারোক্তি দিয়ে একে অপরকে চুম্বন করে আলাপের শুরু করি ও সমাপ্তি টানি। আমাদের এ স্বীকারোক্তিতে ত্রুটি নেই, কপটতা নেই। কিন্তু আমি যে একজন লেখক, অনেকেই আবার ডাকেন 'কবি'। সে হিসেবে আমার তো উচিত আরো ভিন্নরূপে এই অনুভূতিকে তোমার সামনে তুলে ধরে আনা।

জানি, তোমার কোনো অভিযোগ নেই এ নিয়ে। কিংবা কে জানে, অভিযোগটি হয়ত বুকের কোণেই লুকিয়ে রেখেছ। থাকুক, না থাকুক, তবে তোমাকে প্রেমের পরশ মেখে একটি চিঠি লেখা আমার কর্তব্যের মধ্যে তো পড়েই। যদিও একে কর্তব্যের দৃষ্টিতে দেখলে তখন সেই চিঠিতে প্রেম থাকবে না। বরং থাকবে কর্তব্য পালনের একমুঠো বিরক্তি ও তাড়াহুড়ো প্রবণতা। আমি সেটা চাইছি না। আমি চাইছি বুক থেকে চলে আসুক এই প্রেমের স্বীকারোক্তি ও অনুভবের বর্ণনাগুলো।

শুরুটা তাহলে করা যাক ষাটের দশকের কবি রফিক আজাদের 'হ্যালো, রিমোট কন্ট্রোল' কবিতার অংশবিশেষ দিয়ে;

তোমার কোমর ধরে

প্রকাশ্য এ দিবালোকে পার হতে চাই ক্রসরোড-

ঠোঁটে-ঠোঁটে, বুকে বুকে চাই

চোখে-চোখে কথা হবে নিবিড়, নিগূঢ়-

আমার এ দু'খানি পা খুঁজে নেবে তোমার দু'খানি

অপার দূরত্বে এই ভাবে চাই-

শরীরের খাঁজে খাঁজে, ভাঁজে ভাঁজে, পাথুরে গুহায়

শীতার্ত রাত্রিতে চাই, গ্রীষ্মে ও বর্ষায়

প্রতিটি ঋতুতে চাই,

সুগন্ধি শরীর চাই, জিহ্বায় লালায়,

নিষিক্ত রসের মধ্যে চাই ঠোঁটে-ঠোঁটে, বুকে বুকে

কামে-ঘামে উষ্ণ শরীর চাই।

তবুও তো এই কাব্যে ফুটে ওঠল কামভাবের চিত্রটুকু। এখানেও কবির সুরে সুরে আমি যেন বলে ফেললাম তোমার শরীরের প্রতি আমার এমন আকুল কামনার কথা। একেও প্রেম বলা যায়। কিন্তু এ প্রেমটা শরীরিয়, কবিদের প্রেম যেমন হয়। আমি তো আরো অনুভবের গভীরে যেতে চাইছি। তবে কেন সবার আগে এই কবিতাটাই এলো, বুঝলে কিছু?

এ বেলায় তুমি হাসছ, তাই না মায়া? হ্যাঁ, হাসি তো পাবারই কথা। প্রেমময় বর্ণনাকে হাতে তুলে আনতে আমার এমন জোর প্রচেষ্টা তো কৌতুক জাগিয়ে তুলবেই মনোমাঝে। জোর করে কি আর প্রেম আনা যায় বুকে? তা যদি আনা না যায়, তাহলে প্রেমের চিঠিও জোর করে লেখা যায় না। তুমি মনে মনে আমাকে আহ্বান করছ হয়ত, "উফ, হলো তো অনেক। আর চাপ নিও না। শেষে দারুণ চিঠি লিখতেই তুমি ভুলে যাবে।" জানি না, আমার এমন প্রগলভ বর্ণনাসম্বলিত চিঠিগুলো তোমার কাছে 'দারুণ' হিসেবে বিবেচিত হয় কী করে মায়া। এর পেছনে তো ভালোবাসা আছে, তাই না বলো? আমায় ভালোবাসো বলেই তো আমার সাদামাটা চিঠির মাঝে তুমি প্রেম খুঁজে পাও, তাই না বউ?

কিন্তু মন তো মানে না। এখনও সচেতনভাবে তোমাকে তো প্রেমের চিঠি লিখে ওঠতেই পারিনি। আমার চিত্তটুকু তো সন্তুষ্ট হচ্ছে না। আমার ভেতরে এক দারুণ গাঢ় অস্থিরতা কাজ করছে। আমি একে ঝেড়ে ফেলতে পারছিই না।

চিঠি লিখতে গিয়ে হাল ছেড়ে দিতে গিয়ে বারবার তোমার স্নিগ্ধ মুখটা মুখের সামনে ভেসে ওঠছে। সেই স্নিগ্ধ-শীতল মুখ, যে মুখে রাগ আছে, অভিমান আছে, কিন্তু একটিও অভিযোগ নেই। তা থাকবে কী করে! সব অভিযোগ যে বুকে পুষে রেখেছ প্রিয়া আমার।

এই যে তোমার মায়াময়ী মুখ, এটি কল্পনাপটে আনতেও তো দারুণ সুখানুভূতিতে ডুবে যাই। বিছানায় ঘুম বালিশে মাথা রেখে চোখ বন্ধ করে যখন সেই মুখটাকে কল্পনায় ভেসে আনতে চেষ্টা করি, তখন বুকের ভারী ভাবটি কিংবা ক্লান্তিময় চিত্তটি ধীরেধীরে যেন গলে যেতে শুরু করে। প্রশান্ত হতে থাকি। কাঠিন্যে কুঁচকে যাওয়া ভ্রুযুগল সহজতায় সমান হয়ে আসে। ঢেউ খেলে যায় বুকের অনুভূতির হৃদে। রবীঠাকুরের 'সুখের মত ব্যথা' অনুভব করি। সেই ব্যথা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে ওঠে। অতঃপর আমি পাশ ফিরি। অনুভব করি তুমি আমার পাশেই অস্তিত্বশীল আছ। তবুও চোখ খুলি না। চোখ খুললেই যে তোমায় দেখতে পাব না। অনুভবও করা হবে না আর।

একাকীত্বকে বড় ভয় পাই যে। একা থাকার কষ্টকে আমি অভ্যেসে নিয়ে নিয়েছি দিনের জন্যে। কিন্তু রাতে? এখনও রাতের একাকীত্বে অভ্যস্ত নই। তাই তো বারেবারে ঘুম ভেঙে যায়। হাতড়ে খুঁজি মুঠোফোনটি। আবার থমকে যাই। রাতের সেই মধ্য সময়ে তোমার ঘুমের ব্যাঘাত ঘটাতে বিবেকে বাঁধে। কিন্তু কখনও একাকীত্বের এক জমাটবদ্ধ ঘোর থেকে সাতপাঁচ না ভেবে তোমার ফোনেই আমার ডাক পাঠাই। অতঃপর অনুতপ্ত হই। নিজেকে তখন দারুণ স্বার্থপর বলে মনে হয়।

এই একাকীত্ব কবে ঘুচিয়ে নিতে পারব, তা হলফ করে বলতে পারি না। ঘোচাতে তো হবেই। এভাবে একা যে থাকতে পারি না। সময় যে বয়ে চলছেই। জীবনের অপরাহ্নবেলায় পৌঁছে গেলে কি আর উপজাতের অংশে প্রেম অবশিষ্ট থাকবে? এই যা, আমি দেখছি তোমার মনে ভয় ঢুকিয়ে দিলাম মায়া। একদম মন খারাপ কোরো না। এটা মনের ভুলেই বলে ফেললাম। এতটা বিলম্ব-মিলনের আশঙ্কা আমি একেবারেই করি না।

আমি আমার জামা খুলে ফেলার পর আয়নার সামনে দাঁড়াই। আমার বুকের মাঝখানটায় তাকাই। সেখানে হাত বুলিয়ে যাই খানিকক্ষণ। বাজে অভ্যাস, তাই তো? কিন্তু হাত বুলাই কেন বলো তো? স্বমেহন? অবশ্যই না। হাত বুলাই, এ বুকে তোমার পেতে দেয়া মাথাটিকে অনুভব করতেই। তুমি যে এ বুকেই মাথা পেতে আছ মায়া। আর খুব শক্ত করে আমাকে জাপটে ধরে আছ। আমাকে হারাবার ভয় আমার চেয়ে তোমারই তো বেশি। কিন্তু সমস্ত সম্ভাবনা তো তোমার পরিবেশেই বেশি। এই যে ক'মাস পরপর তোমাকে ছেলেপক্ষ দেখতে আসে, এটি তো আমাকে ভাবায়, চিন্তিত করে। আমি ভয় পেয়ে যাই। তোমার সামনে সেটা ফুটিয়ে তুলি না। তুমিও ভাবিত হয়ে যাবে, এ ভয়েই এ অনুভূতি লুকোই। কিন্তু এখন যে বলে ফেললাম, এর কী হবে?

তবু আমি জানি, তুমি অপেক্ষা করবেই। কিন্তু লজ্জা হয়, এতদিন তোমায় অপেক্ষায় রেখে যেতে। সময় তো কম হলো না। আরো কত দীর্ঘ সময় পেরোতে হবে, তাও অজানা। কিন্তু হতাশ নই। বুকে সাহস আছে বলেই এখনও তোমার হাতটা ধরে আছি মায়া। আমার প্রতি তোমার আস্থা আছে বলেই তো এ দীর্ঘ কালক্ষেপণেও আমার হাতে রাখা তোমার হাতের বাঁধন শিথিল হয়ে যায়নি মায়া। এতেই তো সাহস পাচ্ছি। তোমার আস্থাই আমাকে সাহস জোগাচ্ছে, আবার আমার সাহসই তোমার আস্থাকে বাড়াচ্ছে। একে অপরের পরিপূরক হয়ে ওঠার মাঝেই তো প্রেম ও ভালোবাসা পরিপূর্ণতা পায়।

প্রেম তো আনতে পারলাম না চিঠিটায়। লিখতে লিখতে সাদামাটা ব্যক্তিগত অনুভূতিই ফুটে এলো শুধু। এ বেলায়ও ব্যর্থ হলাম। তোমাকেও খুশি করতে পারলাম না। নিজের চিত্তও খুশি হয়ে ওঠল না। তুমি রাগ কোরো না যেন মায়া। তোমায় যে ভালোবাসি। শুধু গদ্যে সেটা ফোটাতে পারি না, এটুকুই যা সীমাবদ্ধতা আমার।

অনেক ভালোবাসা নিও সোনাবউ আমার।

ইতি,

তোমার সুখপাখি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন