কমলা


১.

সন্ধ্যা থেকে মারিয়া মেডামের শরীরটা বেশ খারাপ। বমি হয়েছে বেশ ক'বার। মোড়ের চেম্বার থেকে কাদের ডাক্তারকেও বাসায় আনা হয়েছে। ডাক্তার ধারণা করছেন ফুড পয়জনিং। কিন্তু মারিয়া জানে কেন তার এমনটা হয়েছে । কাউকেই সে বলছে না কারণটা, সেটা জানলে আকরাম হয়তো কাল তাকে স্কুলে যেতে বারণ করবে।

বারো বছরের বিবাহিত জীবনে নিঃসন্তান এই মারিয়া মেডামের বেঁচে থাকার প্রেরণা তার স্কুলের চাকরিটাই । সারাটা দিন বাচ্চাদের মাঝে কাটানো সময়টাই তার শ্রেষ্ঠ সময়। তারপর বাসায় ফিরে আকরামের সাথে সেই একঘেয়ে জীবন। আকরামের যদিও কোন অভিযোগ নেই তার প্রতি। কিন্তু মারিয়া সবটুকুই বুঝে। তাই আকরামের চোখে মারিয়া এখন আর তার প্রতি নিঃশেষ হয়ে যাওয়া ভালোবাসা খুঁজে ফেরে না।

২..

বিকালে মডেল পাইলট হাই স্কুলের হোস্টেল সুপারের রুমের সামনে নবম শ্রেণির ১০/১২ জন ছাত্র জটলা করেছে। তাদের অপেক্ষা করিয়ে হোস্টেল সুপার আর ড্রিল স্যার রাতের খাবার মেন্যু ঠিক করছেন আর বাজারের লিস্টটাও সেরে নিচ্ছেন।

মিলন আর মাহমুদ বারবার উসখুস করছে আর স্যারের রুমে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছে । এবার হোস্টেল সুপার স্যারের সাথে মিলনের চোখাচোখি হতেই সে বললো

-- স্যার আমাদের দরকারি কথা, একটু আসবো?

স্যার অনুমতি দিতেই হুড়মুড়িয়ে সবাই স্যারের রুমে ঢুকে গেল।

-- বলো কি তোমাদের দরকারি কথা। যত্তোসব কাজের সময় আসছে আমার মাথা নষ্ট করতে।

ছেলেরা এক যোগে বললো -- কমলা!

মিলন বললো--আমরা আজ বিকালের নাস্তায় কমলা খেতে চাই।

হোস্টেলসুপার চোখ বড় করে তাকালো আর ভাবলো এরকম আব্দার তো এর আগে ছেলেরা কখনো করে নাই । কোন খাবারের আব্দার নিয়ে আসে না শুধু এক মাংস ছাড়া।

--- হঠাৎ কমলা কেন? কি ব্যাপার! বিকালে তো রোজ লাল চা টোস্ট দেই তোমাদের। আবার সাথে কমলাও দিতে পারবো না। বুঝলে! কথা নাই বার্তা নাই কমলার আব্দার নিয়া আসছে। এভাবে হবে না হেড মাস্টার স্যারের পারমিশন লাগবে। হোস্টেল সুপার স্যার বললেন।

মাহমুদ বললো -- আজ আমরা চা বিস্কুট খাবো না স্যার। কমলা খাবো। আপনে হেড স্যারের সাথে কথা বলে ব্যবস্হা করেন।

৩...

বিকালে মারিয়া বারান্দায় বসে কমলা খাচ্ছে আর ভাবছে, ডাক্তার তাকে দুইদিন বেডরেস্ট দিয়েছে কিভাবে থাকবে দু'দিন স্কুলে না গিয়ে। আবার সেদিনের সেই গন্ধের কথাটা মনে হতেও তার গা গুলিয়ে আসছে। আকরাম একগাদা কমলা হাতে দিয়ে তাকে বারান্দায় বসিয়ে রেখে ঔষধ আনতে গিয়েছে।

কমলার খোসা ছিলতে গিয়ে তার চোখে মুখে কমলার খোসার রস ছিটকে পড়লো। হঠাৎ চোখ বন্ধ করে ফেললো মারিয়া। কিন্তু পরমূহুর্তে একটা মুচকি হাসি দেখা গেল তার ঠোঁটের কোণায়। সে হয়তো তার সমস্যার সমাধান করে ফেলেছে।

৪....

দু'দিন পর মডেল পাইলট স্কুলের তৃতীয় পিরিয়ড শুরুর ঘন্টা পড়লো। মারিয়া মেডাম তৈরী হলেন নবম শ্রেণির সাথে তার রসায়ন ক্লাস নেয়ার জন্য। রুমে ঢোকার আগে ব্যাগ খুলে দেখে নিলেন কমলা আনা হয়েছে কিনা! হুম, আসার আগে আকরাম মনে করে ঠিকই দুটো কমলা ঢুকিয়ে দিয়েছে।

ক্লাস রুমে ঢোকার আগে কমলা ছিঁড়ে একটু গন্ধ নিয়ে ক্লাসে ঢুকলেন মারিয়া মেডাম।

---আসসালামু আলাইকুম মেডাম। কেমন আছেন? ফার্স্টবয় মাহমুদ দাঁড়ালো।

মারিয়া মেডাম সালামের উত্তর দিয়ে তার প্রিয় ছাত্রদের উদ্দেশ্যে একরাশ মিস্টিহাসি ফিরিয়ে দিলেন। তবে তিনি অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন আজ ক্লাসে সেই নোংরা গন্ধটা নেই। সারা ক্লাসে কমলার গন্ধ। আর জানালাগুলোও ছাত্ররা আজ বন্ধ রেখেছে।

বই হাতে মারিয়া মেডাম পড়াতে শুরু করলেন। তবে তিনি এটা বুঝতে পারছেন না সারা ক্লাস কমলার গন্ধে ভরপুর, এটা কিভাবে সম্ভব! ক্লাসের যেপাশেই যাচ্ছেন সেই পাশেই কমলার গন্ধ। মারিয়া মেডাম যখন হেঁটে হেঁটে ক্লাসের এক পাশ থেকে অপর পাশে যাচ্ছেন তখন খেয়াল করলেন তার পেছনে ছেলেরা কিছু একটা করছে।

একবার দুবার না বারবার তার মনে হচ্ছে সে যখন ঘুরে তখনই ছেলেরা পিছনে একটা কিছু করছে। এবার বিরক্ত হয়ে জোরে বইটা টেবিলের উপর রেখে বললেন

-- অনেক হয়েছে! কি করছো তোমরা আমার পিছনে বলো নইলে আমি ক্লাস নিব না এখনই বেরিয়ে যাবো ক্লাস থেকে।

সব ছাত্ররা দাঁড়িয়ে মাথা নিচু করে হাত সামনে বাড়ালো। মারিয়া দেখলো সবার হাতে অনেকগুলো করে কমলার খোসা।

ক্লাস ক্যাপটেন মাহমুদ এগিয়ে এসে বললো

-- মেডাম গত ক্লাসে আমাদের ক্লাসের পাশের সুয়ারেজের পাইপ লিক হওয়ায় যে দুর্গন্ধ চারপাশে ছড়িয়ে পড়েছিলো তাতে ক্লাস করতে আপনার বেশ কষ্ট হচ্ছিলো। আমরা খোঁজ নিয়ে জেনেছি এ কারণে আপনি অসুস্থ ছিলেন দুদিন । তাই আমরা সবাই একটু পরপর কমলার খোসাগুলো আপনার চারপাশে চেপে দিচ্ছিলাম যেন এই বিচ্ছিরি গন্ধে আপনার কষ্ট না হয়।

আপনাকে কষ্ট দিয়ে থাকলে দুঃখিত মেডাম।

পৃথিবীতে কিছু মানুষ আছে যারা আমাদের এমনভাবে ভালোবাসবে ; তাদের ভালোবাসার প্রতিদানে কিছু দিতে হয় না ; শুধু উপভোগ করে যেতে হয়। বিনিময়ে তাদের শুধু ভালোবাসাই বিলিয়ে দিতে হয় ।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন