
সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা
বইয়ের নাম: সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা
রিভিউকারী: আরাফাত শাহীন
প্রথমে একটা প্রশ্ন করি—আপনার দৃষ্টিতে পৃথিবীর সবচেয়ে সেরা মানুষ কারা? প্রশ্নটা একটু কঠিন হয়ে গেল, তাই না?
তাহলে এবার এই সহজ প্রশ্নটার উত্তর দিন। পৃথিবীর সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ কে?
আমি জানি, এবার ঠিকই এই প্রশ্নের জবাব দিতে পারবেন। হ্যাঁ, মুহাম্মাদুর রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ই হলেন পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ; যা মুসলিম অমুসলিম নির্বিশেষে সকল বিবেকবান মানুষই একবাক্যে মেনে নিয়েছেন।
এবার আমরা প্রথম প্রশ্নে ফিরে যাবো। মুহাম্মদ (সা.)-কে যখন সর্বশ্রেষ্ঠ মানবসন্তান হিসেবে মেনে নিতে আমাদের কোনো আপত্তি নেই; তাই সে সময় যে সোনার মানুষেরা তাদের সবকিছু ফেলে তাঁর পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন, সেই স্বর্ণোজ্জ্বল কাফেলাকে সেরা মানুষ হিসেবে মেনে নিতেও আপত্তি থাকার কথা নয়।
•
হ্যাঁ, মানবজাতির ইতিহাসে রাসূলুল্লাহ (সা.) এর পর সেরা মানুষ হিসেবে তাঁরাই অধিষ্ঠিত হয়েছেন। নবীজির পবিত্র পরশ তাঁদের জীবনকে সকল দিক দিয়েই পত্রপল্লবে সুশোভিত করে তুলেছিল। মহান আল্লাহ তাআ'লাও পবিত্র কুরআনে তাঁদের প্রতি সন্তুষ্টির ঘোষণা দিয়েছেন। এমন সৌভাগ্য যাঁদের, তাঁরা কি সেরা মানুষ না হয়ে পারেন?
আমাদের মুসলিম সমাজ আজ তাদের প্রকৃত বীরদের চিনতে ভুল করে বসে আছে; তারা বুঝতে সক্ষম নয় বীরত্বের মাপকাঠি আসলে কী। যুগ যুগ ধরে যে সাহাবিগণ মুসলিম যুবকদের 'আইডল' হিসেবে বিবেচিত হয়ে এসেছেন; কেউ যদি একজন সাহাবির কোনো ঘটনাকে নিজের জীবনে প্রতিফলিত হতে দেখত তাহলে নিজেকে সৌভাগ্যবান বলে মনে করতো, তারাই আজ তাঁদের ভুলে বসে আছে। এমনকি বড় লজ্জার বিষয় হলো, আমাদের সমাজের অনেকেই মাত্র কয়েকজন সাহাবির নাম পর্যন্তও জানে না!
•
ড. সাজেদা হোমায়রা আমাদের প্রজন্মেরই মানুষ। তবে যুগের পাশাপাশি তিনি নিজেদের অতীত সম্পর্কেও সচেতন রয়েছেন। তিনি জানেন—আমাদের তরুণ সমাজের সমস্যার জায়গাটা ঠিক কোথায়। তিনি আরও জানেন, কীভাবে তাদের এই জায়গা থেকে উদ্ধার করে এনে জান্নাতি বাগিচার সন্ধান দেওয়া যায়। তার কলম ধরার উদ্দেশ্যই মূলত এটা। অন্তত বইটি পাঠ করার পর আমার এটাই মনে হয়েছে।
'এটি কিশোর ও তরুণ সমাজের দিকে লক্ষ্য রেখে তাদের উপযোগী করে লেখা হয়েছে।'
যদিও সাজেদা হোমায়রা ভূমিকায় এই বক্তব্য উপস্থাপন করেছেন, কিন্তু আমি তার এই কথার সঙ্গে একমত নই। বইটি শেষ করার পর আমার মনে হয়েছে—এটি শুধু কিশোর-তরুণদের উপযোগী বই-ই নয়, বরং সব বয়েসী পাঠককেই এর বিষয়বস্তু সমানভাবে আকর্ষণ করবে। লেখকের সাবলীল বাক্য, বক্তব্যের যৌক্তিক উপস্থাপন, ঘটনা বর্ণনার পাশাপাশি নিজস্ব অভিমত বয়ান—সবাইকে আকর্ষণ না করে পারবে না।
•
বাংলা ভাষায় সাহাবিদের জীবনীর ওপর অনেক গ্রন্থই রচিত হয়েছে। এগুলোর মধ্যে বিশ্বের নামীদামী লেখকদের অনুবাদ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে মৌলিক বইও। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ আবদুল মাবুদের লেখা ৬ খণ্ডের 'আসহাবে রাসূলের জীবনকথা' সম্ভবত বাংলা ভাষায় এই বিষয়ের মৌলিক বই হিসেবে সবচেয়ে বেশি পরিচিতি পেয়েছেন। সেখানে তিনি আমাদের পরিচিত, স্বল্প পরিচিত বেশিরভাগ সাহাবির জীবনীই আলোচনা করেছেন।
ড. সাজেদা হোমায়রা তার 'সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা' বইয়ে মোট ৪০ জন সাহাবির জীবনী আলোচনা করেছেন। এঁদের সকলেই আমাদের কাছে অন্তত নামের দিক দিয়ে হলেও পরিচিত। এর আগে সাহাবিদের জীবনীর ওপর লিখিত বেশ কয়েকটি বই ঘাটাঘাটি করার সুযোগ হয়েছে। সেখানে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই প্রথমে হযরত আবু বকর রা.-এর জীবনী এসেছে। তবে আমাদের আলোচ্য গ্রন্থে এর ব্যতিক্রম পেয়েছি। ড. হোমায়রা সর্বপ্রথম ইসলাম গ্রহণকারী হযরত খাদিজা রা.-এর জীবনী সবার আগে আলোচনা করেছেন। এই বিষয়টা আমার খুবই ভালো লেগেছে।
•
প্রতিটি রচনার শিরোনামের ক্ষেত্রে অভিনবত্বের পরিচয় দিয়েছেন লেখক। সরাসরি সাহাবিদের নাম ব্যবহার না করে তাঁরা যে কারণে সবচেয়ে বেশি পরিচিত ছিলেন, শিরোনামে সেটি সংযুক্ত করেছেন। বোঝার সুবিধার্থে কয়েকটি শিরোনাম আমি উদ্ধৃত করছি:
*প্রথম ইসলাম গ্রহণকারী নারী 'হযরত খাদিজা বিনতে খুওয়াইলিদ রা.'
*রাসূলুল্লাহর প্রিয় বন্ধু 'হযরত আবু বকর রা.'
*অর্ধপৃথিবীর শাসক 'হযরত উমার ইবনুল খাত্তাব রা.'
*জীবন্ত শহীদ 'হযরত তালহা ইবনে উবাইদুল্লাহ রা.'
এভাবে শিরোনাম লেখার কারণে প্রথম পলকেই একজন সাহাবি সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ একটা তথ্য জানা হয়ে যাচ্ছে। অনেকেই এমন শিরোনাম দেখে বইয়ের ভেতরে প্রবেশ করবার জন্য আগ্রহবোধ করবে বলেই আমার বিশ্বাস।
•
বইয়ের পৃষ্ঠাসংখ্যা ১৯২। এই পৃষ্ঠাগুলোতেই মোট ৪০ জন সাহাবির পবিত্র জীবনী বর্ণনা করা হয়েছে। অনেকের মনেই হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে—এত অল্প সংখ্যক পাতায় এতজন সাহাবির জীবনী লেখা কীভাবে সম্ভব? আমি তাদের প্রশ্নের জবাবে বলবো, এখানে শুধু একজন সাহাবির সম্পর্কে অতি গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা বলা হয়েছে; যেটুকু জানা আমাদের জন্য অবশ্যকর্তব্য। আপনাকে বিস্তারিত জানতে হলে আরও অধিক সংখ্যক বই পড়তে হবে।
এখানে একটা বিষয় আমি খেয়াল করে দেখেছি—ধারাবর্ণনায় কোনো মেদ নেই। যেখানে ঠিক যতটুকু লেখা দরকার সেখানে ঠিক ততটুকুই লেখা হয়েছে। ফলে বইটি পড়তে গিয়ে একদমই বিরক্তি আসবে না। আপনি একটানা শেষ করতে পারলেই সবচেয়ে বেশি স্বস্তি অনুভব করবেন।
বইটি কেন পড়তে বলবো?
অনেকেই আছেন সাহাবিদের সম্পর্কে অনেক গভীর জ্ঞান রাখেন। তাদের জন্য এই বইটি খুব বেশি উপকারী হবে না। তবে জানা বিষয়গুলো একনজরে ঝালাই করে নিতে পারবেন।
কিন্তু যারা নতুন পাঠক, তাদের জন্য খুবই প্রয়োজনীয় একটি বই 'সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা'। বইটিতে অতি সংক্ষেপে দরকারি তথ্যগুলোর সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। তাই আমার মনে হয়—কেউ যদি সাহাবিদের সম্পর্কে জ্ঞানের রাজ্যে প্রবেশ করতে চান, তাহলে এই বইটি প্রবেশপথ হিসেবে বিবেচিত হতে পারে নিঃসন্দেহে।
•
আপনার মনে হয়ত প্রশ্ন জাগতে পারে, এই বইয়ের শুধুই প্রশংসা দেখছি; কোনো সমালোচনা কি আদৌও নেই?
জি সমালোচনা তো অবশ্যই আছে। আর এটি লেখকের দ্বিতীয় বই সম্ভবত। তাই কিছু ভুলভ্রান্তি থেকে যাওয়া অস্বাভাবিক নয়।
সামান্য কিছু ভুল বানান আপনার চোখে পড়বে। তবে তা আহামরি কিছু নয়। লেখক কয়েক জায়গায় কিছু ইংরেজি প্রতিশব্দ ব্যবহার করেছেন। এটা না করলেও পারতেন। তবে এতে পাঠের কোনো ব্যাঘাত ঘটবে না।
বইয়ের বিষয়বস্তু সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সুন্দর প্রচ্ছদ উপহার দিয়েছেন আবুল ফাতাহ মুন্না। শব্দবুনন প্রকাশন-এর দ্বিতীয় প্রকাশনা হিসেবে দারুণ একটা কাজ হয়েছে বলেই মনে করি। বইয়ের বিষয়বস্তুর মতো 'কোয়ালিটি'ও খুবই ভালো মানের হয়েছে।
তাহলে সাহাবিদের সঙ্গে পথচলা শুরু করা যাক 'সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা'-এর মাধ্যমে। কী বলেন সবাই?
______________________________
বইয়ের নাম: সেরা মানুষ ছিলেন যাঁরা
লেখক: ড. সাজেদা হোমায়রা
ধরন: সাহাবিদের জীবনী
প্রকাশনায়: শব্দবুনন প্রকাশন
প্রথম প্রকাশ: একুশে বইমেলা ২০২১
প্রচ্ছদ: আবুল ফাতাহ মুন্না
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৯২
মুদ্রিত মূল্য: ৩০০/-
আপনার মন্তব্য লিখুন