ফোরটি রুলস অফ লাভ


বইঃ দ্য ফরটি রুলস অফ লাভ, 
এ নভেল অফ রুমি (খন্ডঅংশ)
🖊️ Ajmery Sultana Sathi 

কথা বলতে বলতেই এবার কক্ষের ভেতর পায়চারি করতে শুরু করল।শামস, প্রতিটা শব্দ উচ্চারণ করার সাথে সাথে চড়ায় উঠছে তার কণ্ঠস্বর ।
‘কিন্তু এক মুহূর্তের জন্য যদি কল্পনা করা হয় যে শয়তান বলে আসলে কিছুনেই, নরকের অন্ধকার আগুনে তার কোনাে চ্যালা আমাদের পুড়িয়ে কয়লা বানানাের জন্য অপেক্ষা করছে না। এই রক্ত হিম করা ধারণাগুলােকে তৈরি
করা হয়েছিল আমাদের কিছু একটা বােঝানাের জন্য। কিন্তু সেই ধারণাগুলােকে মানুষ পরে ভুলে গেছে, মনে রেখেছে কেবল উপমাগুলােকে।
‘সেই কিছু একটা বলতে তুমি কি বােঝাতে চাইছ?’ দুই হাত বুকের উপর
ভাজ করে প্রশ্ন করলেন শেখ ইয়াসিন।
এই তাে, শেষ পর্যন্ত আপনার মুখ থেকেও প্রশ্ন বের হতে শুরু করেছে,বলল শামস। সেটা হচ্ছে-মানুষ নিজেই নিজের উপর অন্তহীন দুর্দশা ডেকে নিয়ে আসতে পারে। নরক আমাদের মাঝেই রয়েছে, স্বর্গও। কোরআনে বলা হয়েছে, মানুষ সকল সৃষ্টির মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ। শ্রেষ্ঠের চাইতেও শ্রেষ্ঠতর আমরা,
কিন্তু একই সাথে নিকৃষ্টের চাইতেও নিকৃষ্ট স্তরে নেমে যাওয়ার ক্ষমতাও আমাদের আছে। যদি এই কথার পূর্ণ অর্থকে আমরা বুঝতে পারতাম তাহলে অনেক আগেই শয়তানকে খোজা বাদ দিয়ে নিজেদের অন্তরে দৃষ্টিপাত
করতাম। আমাদের যা করা উচিত তা হলাে আত্ম-সমালােচনা, অপরের দোষা খোজা নয়।
‘তুমি ইচ্ছে করলে যত খুশি আত্ম-সমালােচনা করতে পারাে, কেউ বাধা দিচ্ছে না তােমাকে,' জবাব দিলেন শেখ ইয়াসিন। কিন্তু একজন আদর্শ গবেষকের দায়িত্ব হচ্ছে তার সমাজের দিকে খেয়াল রাখা।
তাহলে আপনাকে একটা গল্প বলি,' বলল শামস। কণ্ঠস্বরে এমন গাম্ভীর্য যে সে মজা করছে কি না বােঝা মুশকিল।
সে যা বলল তা এ রকম :
চার সওদাগর এক মসজিদে প্রার্থনা করছিল। এই সময় মুয়াজ্জিন ভেতরে প্রবেশ করল। প্রথম সওদাগর তার প্রার্থনা থামিয়ে প্রশ্ন করল, মুয়াজ্জিন!
প্রার্থনার সময় কি শেষ হয়ে গেছে? নাকি এখনও সময় আছে আমাদের হাতে?
দ্বিতীয় সওদাগর এবার তার প্রার্থনা থামিয়ে প্রথমজনের দিকে তাকাল।
বলল, “আরে, তুমি প্রার্থনার মাঝখানে কথা বললে কেন? তােমার প্রার্থনা তাে
নষ্ট হয়ে গেছে, এখন আবার নতুন করে শুরু করতে হবে!
এই কথা শােনার পর তৃতীয় সওদাগর দ্বিতীয়জনের উদ্দেশ্যে বলে উঠল,
“আরে বােকা, তুমি ওকে দোষ দিচ্ছ কেন? তােমার উচিত ছিল নিজের
প্রার্থনায় মনােযােগ ধরে রাখা। এখন তাে তােমার প্রার্থনাও নষ্ট হয়ে গেল!
এবার চতুর্থজনের মুখে হাসি ফুটল। উঁচু গলায় বলে উঠল সে, কি বােকা ওরা! সবাই গড়বড় পাকিয়ে ফেলেছে। সৃষ্টিকর্তাকে ধন্যবাদ যে আমি ওদের মতাে বােকামী করিনি।
এই গল্প বলার পর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিত সবার দিকে তাকাল শামস । প্রশ্ন করল, “কি মনে হয় তােমাদের? সওদাগরদের মধ্যে কার প্রার্থনা নষ্ট হয়েছে
বলে তােমাদের ধারণা?
কিছুক্ষণ নিচু গলার গুঞ্জন শােনা গেল কক্ষের ভেতর, নিজেদের ভেতর।
সম্ভাব্য উত্তর নিয়ে আলােচনা করলাম আমরা। শেষ পর্যন্ত পেছন থেকে কেউ একজন বলে উঠল, দ্বিতীয়, তৃতীয় এবং চতুর্থ সওদাগরের প্রার্থনা নষ্ট হয়েছে। কিন্তু প্রথম সওদাগরের কোনাে দোষ নেই, কারণ সে শুধু মুয়াজ্জিনের কাছ থেকে নিশ্চিত হতে চেয়েছিল।
‘হ্যা, কিন্তু তাই বলে নিজের প্রার্থনা বাদ দিয়ে এভাবে কথা বলে ওঠা উচিত হয়নি তার, পাল্টা জবাব দিল ইরশাদ। বােঝাই যাচ্ছে সে সওদাগরদের সবারই ভুল হয়েছে, শুধু চতুর্থজন বাদে। সে তাে সেফ নিজের সাথে কথা বলছিল।


কারও দিকেই তাকালাম না আমি, কারণ দুটো উত্তরের কোনােটাই আমার পছন্দ হয়নি। তবুও ঠিক করেছি যে এ ব্যাপারে কিছু বলব না। কারণ আমার যা মতামত, তা সবার পছন্দ হবে বলে মনে হয় না।
কিন্তু এই চিন্তাটা আমার মাথায় আসার সাথে সাথেই শামস তাবরিজি আমার দিকে আঙুল তাক করল। বলল, এই যে, তুমি! তােমার কি মনে হয়?


কথা বলার সাহস পাওয়ার জন্য জোরে একটা ঢােক গিলতে হলাে আমাকে। সওদাগরদের যদি ভুল হয়েও থাকে তবে তা এ জন্য হয়নি যে তারা প্রার্থনার মাঝখানে কথা বলেছে,' বললাম আমি, তাদের ভুলটা ছিল, সৃষ্টিকর্তার সামনে নিজেদের মনকে সম্পূর্ণ সঁপে দেয়ার বদলে তারা নিজেদের চারপাশে কি ঘটছে সে দিকে বেশি খেয়াল করেছে। তবে তারপরেও, আমি বলব যে তাদের দোষ ত্রুটির বিচার করতে গেলে আমরাও একই রকম ভুল করব।'


তাহলে তােমার জবাবটা কি দাঁড়াল?' প্রশ্ন করলেন শেখ ইয়াসিন। হঠাৎ করেই যেন এই আলােচনায় আগ্রহী হয়ে উঠেছেন তিনি।
‘আমার জবাব হচ্ছে, সওদাগরদের মধ্যে সবাই একই কারণবশত ভুল করেছে। কিন্তু তাদের কাউকেই দোষী বলা যায় না, কারণ তাদের দোষ ত্রুটি বিচার করার ভার আমাদের উপর নেই।'
এক পা এগিয়ে এল শামস তাবরিজি, তারপর অদ্ভুত মায়া আর মমতাভরা চোখে তাকাল আমার দিকে। মনে হলাে, আমি একটা ছােট্ট ছেলে,বাবা-মা’র ভালােবাসা ভরা দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে আছি। আমার নাম জানতে চাই।
সে। বললাম আমি। এবার শেখ ইয়াসিনের দিকে ফিরে সে মন্তব্য করল, ‘আপনার ছাত্র হুসাম হচ্ছে প্রকৃত সুফি হৃদয়ের অধিকারী।

লজ্জায় কান পর্যন্ত লাল হয়ে উঠল আমার। আজ পড়াশােনা শেষ হওয়ার পর যে শেখ ইয়াসিন আমাকে ধমকাবেন, এবং বন্ধুদের সবাই আমাকে নিয়ে ঠাট্টা করবে-এ নিয়ে কোনাে সন্দেহ নেই। কিন্তু সকল দুশ্চিন্তা যেন এক মুহূর্তের মধ্যেই হারিয়ে গেল কোথায়। সােজা হয়ে বসলাম আমি, তারপর শামসের দিকে তাকিয়ে হাসলাম। জবাবে আমার দিকে তাকিয়ে একবার চোখ টিপল সে, তারপর হাসি মুখেই আবার ফিরে গেল নিজের ব্যাখ্যায়।

‘সুফি ব্যক্তি বলে, “আমার উচিত অপর মানুষকে বিচার করার চাইতে স্রষ্টার সাথে পরিচিত হওয়ার প্রতি বেশি গুরুত্ব দেয়া।” আর অন্য দিকে একজন গবেষক কেবল অপরের দোষ ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়।কিন্তু প্রিয় ছাত্রগণ, এটা যে তাদের নিজেরই ত্রুটি তা তাদের চোখে পড়েনা।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন