
জোসনাফুল
আবদুল্লাহ মাহমুদ নজীবের 'জোছনাফুল' পড়ে শেষ করলাম। এখনও একটা ঘোর-মেশানো ভালোলাগা কাজ করছে বুকের ভেতর। আমাদের সমবয়সী একজন মানুষ তার চিন্তার গভীরতা এবং ভাষার প্রাঞ্জলতায় কতদূর এগিয়ে গেছেন, বইটি না পড়লে বোঝার সাধ্য ছিল না। ভাববেন না বাড়িয়ে বলছি। এই জাতীয় বইয়ের প্রশংসা করতে না পারলে নিজেকে বড় অপরাধী বলে মনে হয়।
প্রায় বছরখানেক হলো ইতিহাস আর ধর্মীয় বিষয়ক বইপত্র পড়তে পড়তে নিজের গতি কেমন শ্লথ হয়ে এসেছিল; একটা আড়ষ্টতা যেন চেপে বসেছিল ভারি বোঝার মতো। 'জোছনাফুল' সেই ভারি বোঝাটাকে হালকা করেছে। পড়াশোনায় একটা উদ্যমমাখা গতি ফিরে এসেছে আবার। শান্ত পুকুরে ঢিল ছুঁড়ে কাঁপন তোলার মতো একটা ঢেউ জেগে উঠেছে চিন্তার জগতে।
প্রবন্ধগল্পের বই 'জোছনাফুল'। মানে—লেখক এখানে প্রবন্ধ লিখেছেন গল্পের আদলে। অথবা এমনও হতে পারে—তিনি গল্প বলছেন প্রবন্ধের মতো করে। প্রতিটি লেখা শুরু হয়েছে লেখকের নিজের কোনো গল্প দিয়ে। কিন্তু ধীরে ধীরে যখন তিনি গভীরে প্রবেশ করেছেন, তখন সে গল্প আর তার একার থাকে না; গল্পের অংশ হয়ে পড়ি আপনি আমি সকলেই।
আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীবের ভাষাজ্ঞান বেশ ঋদ্ধ। বাংলা, আরবি, উর্দু, ইংরেজি ভাষাগুলো তার বেশ ভালোমতো আয়ত্ত আছে বলেই মনে হয়। তা না হলে সরাসরি উর্দু বা আরবি থেকে অনুবাদ করা সম্ভব হতো না। অনুবাদ তো শুধু অনুবাদই নয়—একেবারে কাব্যানুবাদ!
মোট চৌদ্দটি লেখা স্থান পেয়েছে 'জোছনাফুল' গ্রন্থে। এদের মধ্যে 'তোমাকে ভালোবাসি কেন' একটি পুরো কবিতা এবং কবিতাটি বইয়ের শেষে সংযুক্ত হয়েছে। তাছাড়া বাকিগুলো প্রবন্ধ অথবা গল্প—যা খুশি সেই নামেই ডাকা যায়।
আমি গভীর মনোযোগের সাথে বইটি পড়েছি। যখন ভাষার দিকে নজর পড়েছে তখন ক্ষণিকের জন্য মনে হয়েছে, আমি যেন আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের 'ভালোবাসার সাম্পান' পড়ছি। আবার যখন চিত্রকল্প কিংবা উপমার দিকে খেয়াল এসেছে, তখন মনে হয়েছে আমার সামনে বুঝি সৈয়দ আলী আহসানের 'জীবনের শিলান্যাস'!
আমার প্রিয় লেখকদের একজন বুলবুল সরওয়ার। তার 'ঝিলাম নদীর দেশ' আমাকে মোহাবিষ্ট করে রেখেছে বহুদিন। আহা! এমন ভ্রমণ-উপন্যাস ক'টাই বা আছে বাংলা সাহিত্যে! 'জোছনাফুল' দু-একবার আমাকে এই বইয়ের কথাও মনে করিয়ে দিয়েছে। বুলবুল সরওয়ারও তো লেখার ফাঁকে ফাঁকে মানানসই কবিতার লাইন ব্যবহার করেন!
'জেছনাফুল' বইয়ে প্রচুর তথ্য রয়েছে। গ্রন্থপঞ্জি-তে আরবি, বাংলা, ইংরেজি মিলিয়ে যে বিয়াল্লিশটি বইয়ের তালিকা রয়েছে তাতেই বিষয়টা স্পষ্ট হয়ে যাবে। তবে লেখক কোথাও পাণ্ডিত্য ফলানোর চেষ্টা করেছেন বলে মনে হয়নি। কেন যেন মনে হয়েছে—নিজের মতো তিনি তার লেখা থেকেও কিছুটা আড়ালেই অবস্থান করেছেন!
'শক্তিমান কবিদের কৃতিত্ব এখানেই। তারা প্রচলিত পথে হাঁটেন না, নিজস্ব পথ প্রচলন করেন। চলমান স্রোতের বিপরীতে সাঁতার কাটতে সবাই পারে না। এর জন্য যোগ্যতা, আত্মবিশ্বাস, উদ্যম, সাহস ও শক্তির প্রয়োজন।'
সূর্যশৌর্য শিরোনামের লেখাটির এমন বক্তব্যের সঙ্গে আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীবকে মেলাতে গেলে দেখতে পাই, চারিদিকে যখন অবিশ্বাসের রণহুংকার, বাংলা ভাষাকে যখন কতিপয় অবিশ্বাসী পৈতৃক সম্পদ মনে করছে, তখন তিনি বিশ্বাসের ঝান্ডাহাতে শক্তপায়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন। ভাষার ওপর তার যে দখল, তাতে মনে হয়েছে, তিনি বহু বিশ্বাসী লেখকের পথপ্রদর্শক হিসেবে ভূমিকা রাখতে পারবেন।
এতক্ষণ তো শুধু প্রশংসাই করে চললাম। এই বইয়ের কি কোনো নিন্দামন্দ নেই? হ্যাঁ, অবশ্যই আছে। একটা বইয়ের সমালোচনা না থাকলে তা লেখা পুরোপুরি বৃথা। তবে এই বইয়ে সামান্য সমালোচনা করার যে জায়গা রয়েছে, সেটা লেখকের বয়সের কারণে। একটা মানুষের বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীবের লেখায় সামান্য যেটুকু অপরিপক্কতা সেটা বয়সের সঙ্গে সঙ্গেই মিলিয়ে যাবে বলে বিশ্বাস করি।
'মানুষের জীবনে এগিয়ে যেতে শেখা যতটা জরুরি, কোথায় গিয়ে থামতে হয়, সেটা বুঝতে পারা তার চেয়ে বেশি জরুরি।'
(নীলমিল; পৃষ্ঠা-১২৩)
নজীব জানেন তার লেখায় কোথায় গিয়ে থামতে হবে। লেখকের মতো আমারও জানা দরকার শেষবিন্দু সম্পর্কে। তাই এখানেই সমাপ্তি টানছি।
_______________________________
বইয়ের নাম: জোছনাফুল
লেখক: আব্দুল্লাহ মাহমুদ নজীব
প্রকাশনায়: গার্ডিয়ান পাবলিকেশন
প্রচ্ছদ: নাঈমা তামান্না
ধরন: প্রবন্ধগল্প
পৃষ্ঠা সংখ্যা: ১৪৪
মুদ্রিত মূল্য: ২৫০/- (হার্ডকভার)
আপনার মন্তব্য লিখুন