আসমান


বই নিয়ে আলোচনাঃ আসমান। 

 

মাদকতা-নেশা, ধর্ম, দর্শন, যুদ্ধ ও বন্দী জীবন থেকে মুক্তির পরিভ্রমণ কাহিনী নিয়ে লতিফুল ইসলাম শিবলী এর লিখিত উপন্যাস আসমান। এই বইটির মাধ্যমেই লেখকের সাথে আমার প্রথম পরিচয়। 

 

রুশো ও ওমরের হতাশাজনক নেশাগ্রস্থ বাউণ্ডুলে জীবন বুড়িগঙ্গা নদী হয়ে মসজিদের ইমামের কাছে আত্মসমর্পণ, মায়ের পাশে তাহাজ্জুদের নামাজ, তাবলীগ জামায়েতের মাধ্যমে পাকিস্তান, সেখান থেকে আফগানিস্তানের যুদ্ধ প্রান্তর, আহত হওয়ার বিশ্রামে প্রেম রোমান্টিকতার পূনঃ আগমন আবার বিচ্ছেদ, ভালোবাসার স্বজনদের হাড়ানো, বোমা, গোলা, ড্রোন হামলার মূহ মূহ আক্রমন, কাবুল হতে কান্দাহারে ব্যর্থ আক্রমন, গ্রেপ্তার হয়ে গুয়েতেমালা কারাগারে নির্মমতার মাঝেও আল্লাহর উপর পরিপূর্ণ আস্থা এবং ১২ বছরের বন্দীজীবন শেষে প্রিয়জনের সাথে পূত্রসহ মিলন দিয়ে সাজানো পুরো উপন্যাসটি এক অন্যরকম জগতে নিয়ে গিয়েছিলো আমাকে। নেশা, ধর্ম, যুদ্ধ, প্রেম এর মাঝে আল্লাহ প্রেমের দর্শন যেনো ফুটে উঠেছে প্রতিটি লাইনের পরতে পরতে।

 

উপন্যাস পড়ে চোখে পানি আসার ঘটনা আমার খুবেই কম কিন্তু এই উপন্যাস পড়তে যেয়ে কখন যে চোখ সিক্ত হয়ে পড়েছিলো তা আমিও নিয়ন্ত্রণ করতে পারিনি।

 

বইয়ের কিছু টুকরো কথা এখানে তুলে ধরছি উপন্যাসটির ভাব বুঝানোর জন্য।

 

"হৃদয় আল্লাহর ঘর। মানুষের হৃদয়টা তৈরি করা হয়েছে এই জন্য যে সেখানে শুধুমাত্র আল্লাহ থাকবেন। সে ঘরে আল্লাহ ছাড়া অন্য কিছু ঢুকালেই শুরু হবে জাগতিক অশান্তি।"

 

"সসীমকে ভালোবেসে করেছ পূজা

ভালোবেসে হয়ে গেছ দাস

তোমার অনন্ত মন আর কারো নয়

এক অসীম প্রভুর নিবাস।

 

‘তিন ধরনের লোক মসজিদের আশেপাশে ঘুরঘুর করে। ফকির, জুতা চোর আর মজনু।

 

দুঃখ-কষ্টের ভার কেউ কারোটা বহন করতে পারে না। সেটা কাঁধে নিয়েই মানুষকে নির্দিষ্ট পথ আর সময় অতিক্রম করতে হয়। সাহসী আর বুদ্ধিমানেরা ধৈর্যের সাথে এই পথ আর সময়টুকু অতিক্রম করে। বোকারা চায় তার সেই ভার অন্য কারো কাঁধে কিছুটা তুলে দিতে। তোরা যেটাকে বলিস শেয়ার করা। মানুষের ভেতরের কষ্টটা অপার্থিব, আত্মিক, আধ্যাত্মিক। আত্মিক শক্তিসম্পূর্ণ কোনো মানুষ যদি তোর সেই কষ্টের সময়টুকুতে তোর বন্ধু বা চলার সাথি হয় তা হলে দেখবি তোর কষ্টের সময় আর পথ খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যাবে। এর বাইরে দুর্বল অন্তরের বন্ধুরা তোর মনের আগুনআগুনে বাড়তি কিছু খড়কুটো তুলে দেওয়া ছাড়া কিছুই করতে পারে না। এছাড়া আদতে কষ্টের কোনো শেয়ার নেই।’

 

"সসীম মানুষের ব্রেন ধারণ করে অসীমের জ্ঞান। সেই জ্ঞান লাভ করার পর লোভী মানুষ অসীমকে ছুঁতে চায়, চায় অমরত্ব।"

 

বাহ, সুন্দর করে বলেছ, এখন বলো, এই সসীম মহাবিশ্বের ভীতরে একটা অসীম বস্তু আছে, বলো তো সেটা কী?’

 

ওমারকে খুব বেশি ভাবার সময় না দিয়েই ইমাম সাহেব বললেন—

 

‘সেই অসীম বস্তুর নাম হৃদয়। এই জন্য বলা হয় অন্তরের চাহিদা অসীম। এই অসীম অন্তর বা হৃদয় সৃষ্টি করা হয়েছে এক অসীম সত্তার জন্য, সেই অসীম সত্তার নাম— আল্লাহ।’

 

অন্ধকার জঙ্গলটা হলো পৃথিবী, সূর্যোদয় পর্যন্ত আমাদের আয়ুকাল আর টর্চলাইট হচ্ছে সত্য। তোমার হাতে যখন সত্য থাকবে তখন সেই সত্য দিয়ে পৃথিবীর সবকিছু তুমি যাচাই করতে পারবে। আমি সত্যটা ভালোমতো জেনেছিলাম তাই বাকিগুলো চেনা আমার জন্য সহজ ছিল।’

 

ব্যক্তি শুদ্ধ হলে সমাজ শুদ্ধ হবে, সেই শুদ্ধ ব্যক্তি, সমাজ, রাষ্ট্র তৈরি করলে সেটা হবে কল্যাণ রাষ্ট্র। তেমন কল্যাণ রাষ্ট্র তার নাগরিকের জন্য যেমন উপকারী তেমনি বাদবাকি পৃথিবীর জন্যও উপকারী।’

 

 ‘ইমান শুরু হয় অন্তর থেকে, পরে দেহের বাইরে ইসলাম রূপে সেটা প্রকাশ পায়। ইসলাম শুরু হয় বাইর থেকে পরে অন্তরে প্রবেশ করে সেটা পূর্ণতা পায়। তুমি দেখতে যেমনই হও না কেন, তোমার কর্মটাই ইসলাম।’

 

তুমি যখন অন্ধকারের আসল রূপটা চিনে যাবে তখন তোমাকে আর কোনোভাবেই অন্ধকারে ফিরিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে না। এই অন্ধকারকেই বলে কুফর। কুফর অর্থ যা সত্যকে ঢেকে রাখে। 

 

বইয়ের নামঃ আসমান

লেখকের নামঃলতিফুল ইসলাম শিবলী।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন