
একটা দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
বুক রিভিউ : একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়
লেখক : রউফুল আলম
প্রকাশনা : সমগ্র প্রকাশন
মুদ্রিত মূল্য : ৩৫০ টাকা
পৃষ্ঠা :১৯২
বই মেলা থেকে বইটি নিয়ে পরদিন বাড়ির উদ্দেশ্যে ট্রেনযাত্রা। ট্রেন কিছুক্ষণ চলার পর বইটি হাতে নিলাম।একটু চোখ বুলানো যাক।
বইয়ের নাম যেহেতু "একটি দেশ যেভাবে দাঁড়ায়"
সেহেতু একটি দেশের আর্থসামাজিক অবস্থা,অবকাঠামোগত, রাজনৈতিক অবস্থা ও এ থেকে উত্তরণের বিষয় সম্বন্ধে আলোচনা করা হবে। তো চলুন দেখে নেওয়া যাক কি মেসেজ আছে বইটিতে। আর বইটিতে ছোট ছোট করে প্রবন্ধ এমন ভাবে সাজানো রয়েছে যে কাউকে বইটি পড়াতে আকৃষ্ট করবে।
>>লেখক শ্রদ্ধেয় রউফুল আলম স্যার গণতান্ত্রিক উপায়ে অথবা নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে কিংবা মেগা প্রকল্প গ্রহণ করে দেশের সামগ্রিক অবস্থা পরিবর্তনের কথা বলেননি। বলেছেন দেশের আমূল পরিবর্তন আসতে পারে শুধুমাত্র এবং শুধুমাত্রই উন্নত শিক্ষাব্যবস্থার মাধ্যমে। সেই শিক্ষাব্যবস্থাটা অভিভাবকদের গোল্ডেন এ+ এনে দিবে না কিংবা বছর বছর পাশের হার বাড়াবে না। এমন হবে না যে ফটোকপির দোকানে প্রশ্ন পাওয়া যাবে আর তা ফাঁস করে স্বপ্নের বিশ্ববিদ্যালয় অথবা মেডিকেল এ চান্স পাবে।
>>এদিকে ট্রেনটি শহর, রাস্তা পেরিয়ে গ্রামে প্রবেশ করল। চারদিকে শুধু সবুজ ধানক্ষেত।আহা কি মনোরম পরিবেশ। কিন্তু আমরা তো পরিবেশটাই দেখলাম। কিন্তু এখানে রয়েছে একজন কৃষক এর নিত্যদিনের কঠোর শ্রমঘাম।
একজন কৃষকের ধান থেকে চাল পেতে গেলে অনেক পরিশ্রম করতে হয়। ধানের বীজ বুনো, বীজ তুলো,আবার চাষকৃত জমিতে ধান রোপণ করো, সেচ দাও,সার দাও,নিড়ানি দাও,ধান কাটো, মাড়াও, সেদ্ধ করো, ধান ভাঙিয়ে অবশেষে চাল পাও।
আর এদিকে লেখক দেখিয়েছেন একটি দেশ কে এগিয়ে নিতে চাইলে সিলেবাস ভিত্তিক বই পড়ে,মুখস্থ করে, পরীক্ষায় তা গলাধঃকরণ করে,পাশ করে, সরকারি চাকরী নয়ত বেশি মার্কস পেয়ে (অবশ্য এখন বেশি মার্কস বা সিজিপিএ এর দাম নেই) বিশ্ববিদ্যালয় এর শিক্ষক হয়ে, বিভিন্ন প্যানেলে নির্বাচন করে আর টক শো করে চলবে না। যেটা লাগবে সেটা গবেষণা ভিত্তিক পড়াশোনা আর ব্যবহারিক জ্ঞান। লাগবে উচ্চশিক্ষা,ঘণ্টার পর ঘণ্টা ল্যাবে পড়ে থেকে একটি সাধারণ বিষয়কে অসাধারন করে তুলে আনা, সেটার ভিতর থেকে ছেঁকে ছেঁকে নির্যাস বের করা। একটি দেশ,সমাজ,রাষ্ট্র কিভাবে, কোন দিক দিয়ে তার উন্নতি ঘটাবে তা খুঁজে বের করা। পরিবেশে দূষণ কমানোর জন্য নতুন প্রযুক্তির সহায়তা নেওয়া, পরিবেশ বান্ধব জ্বালানির আবিষ্কার করা, নতুন নতুন তত্ত্ব দিয়ে গণিত, ফিজিক্সের সমস্যা সমাধান করা, অবকাঠামো দিক দিয়ে নতুন প্রযুক্তির ব্যবহার, ঔষধ শিল্পে রোগ নিরাময়ের ড্রাগ তৈরি করা এসব আসবে শুধু গবেষণার মাধ্যমে।কিভাবে সূক্ষ্ম গবেষণার মাধ্যমে দেশকে তার সর্বোচ্চ শিখড়ে নেওয়া যায় সেই পথ বাতলে দিয়েছেন।
>>যদি রাজনৈতিক মঞ্চে দাঁড়িয়ে গলা ফাটিয়ে দেশকে আগানো যাইত তাহলে জাপানিজ,চীনা,কোরিয়ানরা গবেষণা খাতে হাজার হাজার কোটি টাকা লগ্নি করত না। একদিকে তারা পারমানবিক বোমা বানাচ্ছে অন্যদিকে দেশ গঠনের কারিগর তৈরি করতেসে। যদি পারমানবিক বোমা বানানোই যদি শক্তি প্রদর্শনের মূল হতো তাহলে চীনারা ২২/২৩ বছরের ছেলে মেয়েদের ভিনদেশে উচ্চশিক্ষার জন্য পাঠাত না। শিক্ষা খাতে বরাদ্দ না করে তার পুরোটাই সামরিক খাতে ব্যয় করত।
তারা এত শক্তিধর এবং আর্থসামাজিক সহ সকল খাতে অদ্বিতীয় কেন? আবিষ্কার এর দিক থেকে তাদের ধারেকাছেও কেও নেই কেন? কারণ তাদের তো আমাদের মত ইউজিসি ও স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় নেই। নেই ইনিয়ে বেনিয়ে প্রমোশন ওয়ালা শিক্ষক। পুরোটাই হচ্ছে তাদের শিক্ষাব্যবস্থার সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা এবং তা সুনিপূণ ভাবে বাস্তবায়ন।
অন্যদিকে আমরা সাধারণ মফস্বল থেকে উঠে আসা নিম্নবিত্ত,মধ্যবিত্তরা প্রতিনিয়ত সেশন জট কমানো নিয়ে স্যারদের কাছে ধরনা দিচ্ছি।অথচ তাদের এদিকে কর্ণপাতই নেই। ইউজিসি সহ সকল বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে কেন যে কোন সিদ্ধান্ত নেয় না সেটা বোধগম্য নয়।
যখন তারা ল্যাবে খাওয়ার জন্য সময় পাচ্ছে না নতুন কোন থিওরি আবিষ্কার এর নেশায়,আমরা তখন ফেসবুকে সহমত ভাইয়ের ঝড় তুলতেসি ।আবার পরিবারের চিন্তায় অনেকেই জীবনের অমূল্য সময় কে টিউশনির পিছনে ব্যয় করছি। অন্যদিকে আমাদের শিক্ষকরা লাল,নীল দল নিয়ে কাঁদাছোড়াছুড়িতে ব্যস্ত।
>>যদি পরীক্ষায় পাশই মুল কথা হতো তাহলে নেপোলিয়ান তো আর এমনি এমনি বলত না, তোমরা আমাকে একটি শিক্ষিত মা দাও আমি তোমাদের একটি শিক্ষিত জাতি দিব।
তবে কি আমরা শিক্ষিত জাতি নই?আমাদের কি মেধা নেই? আছে তবে তা এই মেধার সর্বোচ্চ সদ্ব্যবহার হচ্ছে বিভিন্ন চাকরীর পরীক্ষায় বসা অব্দি।পড়ো, পড়ো এবং পড়ো আর তারপর ভাল চাকরী খুঁজো,সুন্দর দেখে মেয়ে বিয়ে করো,মোটা অংকের বেতন নাও। এদিকে দেশ রসাতলে গেলেও সমস্যা নাই।
>>আসলে আমাদের ধারণাই নেই যে গবেষণা করে হবে টা কি। ডক্টরেট, পিএইচডি করলে কি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার পদে চাকরী পাব?তখন বয়স তো ৩০ পেরিয়ে যাবে। পিএইডির সার্টিফিকেট নিয়ে তো দেশে গবেষণা করে ভাত পাওয়া যাবে না। আবার তা তো আর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হবার জন্য যথেষ্ট না।অথচ উন্নত রাষ্ট্রের ২২-২৩ বছরের তরুণেরা দিব্যি গবেষণা করে ৩০ এর আগে দেশে ফিরে গিয়ে দেশ গঠনের কাজে যোগদান করতেসে। এমনকি তাদের দেশে এমন অনেক প্রকল্প নেওয়া হয়েছে তাদের গবেষণার জন্য। তোমাদের আমরা সমস্ত খরচ দিব,তোমরা তোমাদের মত পড়ালেখা চালিয়ে যাও।গবেষণালব্ধ কাজ করো। আর যে জ্ঞান আহরণ করলে তা দেশে এসে খাটাও।
>>কিন্ত এক্ষেত্রে আমাদের দেশেবঅর্থনৈতিক সমস্যাটা প্রকট হয়ে উঠে ছাত্র থাকাকালীন। আমরা নিজের খরচ নিজে চালাব নাকি গবেষণা করব। মগজ বলে গবেষণা করে তো পেটে ভাত জুটবে না। এক্ষেত্রে স্যার সুন্দর করে তা মোকাবিলা করার কথা বলেছেন। তিনি লিখেছেন,
"দারিদ্র মানুষের বড় হবার পথে অন্তরায় তবে একমাত্র বাধা নয়। "
"দারিদ্য নিয়ে যারা ভয় করে তাদের আমি পাথর থেকে ভাস্কর্য হয়ে যাওয়ার কথা বলি। পথের ধারে পড়ে থাকা পাথর কেউ লক্ষ্য করে না। অথচ সেই পাথর দিয়ে ভাস্কর্য তৈরি করা হয়, মানুষ সেটা শিল্পের চোখে দেখে"।
"আজ যা হয়নি, কাল তা হবে। আজ যা নেই, কালবতা ধরা দেবে। আজ যা পারেননি,কাল তা পারবেন। আজ যে উপেক্ষা করছে, কাল সে দেবে সালাম। জীবনকে বাঁচিয়ে রাখুন। বেঁচে থাকা আর বাঁচার জন্য সংগ্রাম করাই সুন্দরতম। "
>>একটি কথা যোগ না করে পারলাম না।
১৯৭১-৭৩ ও ’৭৪ সালে মওলানা ভাসানী সন্তোষে ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে জাতীয়পর্যায়ে তিনটি শিক্ষাসংক্রান্ত সম্মেলনের আয়োজন করেছিলেন।
দেশের খ্যাতনামা শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, সাহিত্যিক ও সাংবাদিকরা এতে জোগদান করেছেন। তাদের নিয়ে শিক্ষা পরিকল্পনাবিষয়ক বেশ ক’টি সেমিনার, সিম্পোজিয়াম করেছেন তিনি। এগুলোতে দেখেছি, সারা দেশের শতাধিক সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, অধ্যাপক, সাহিত্যিক, কবি এমনকি শিল্পীরাও এসেছিলেন। উপস্থিত বরেণ্য চিন্তাবিদরা একটি কল্যাণমূলক শিক্ষাব্যবস্থা কী রকম হতে পারে তার ওপর বক্তব্য পেশ করেছেন। যে শিক্ষা গ্রহণের মাধ্যমে একজন আদর্শ নাগরিক গড়ে উঠতে পারে তার চিন্তাভাবনা পেশ করেছেন। তার এসব অনুষ্ঠান নিজের প্রতিষ্ঠিত সন্তোষের দরবার হলে অনুষ্ঠিত হয়। মওলানা ভাসানী সন্তোষে তার ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনা বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন। দেশের বরেণ্য শিক্ষাবিদদের পরামর্শ নিয়ে এবং হজরত শাহজামান রহ:-এর মিশনকে গ্রহণ করে সে অনুযায়ী একটি সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা গ্রহণ করেন। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় পরিকল্পনার মধ্যে ছিল সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থা অর্থাৎ শিশু বা নার্সারি শিক্ষা থেকে শুরু করে প্রাথমিক, মাধ্যমিক, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি গবেষণামূলক অর্থাৎ পিএইচডি পর্যন্ত শিক্ষাব্যবস্থা প্রচলন করা। এছাড়া, সূচি শিক্ষা ও তাঁতশিক্ষা,মৎস্য বিভাগ, চিকিৎসাবিদ্যা, পশুপালন ও সংরক্ষণ বিভাগ, এভাবে বিশাল এক কর্মকাণ্ড নিয়ে একটি আদর্শ প্রতিষ্ঠান ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয় গড়ে তোলার স্বপ্ন দেখলেন এবং স্থাপন করলেন সন্তোষ ইসলামি বিশ্ববিদ্যালয় যেটি বর্তমানে মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় নামে পরিচিত।টাংগাইল এর সন্তোষ এ তিনি এর আদলে যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান তৈরি করেছিলেন সেখানে একজন শিক্ষার্থী কেরোসিন এবং ইট ব্যতিত জীবন চলার জন্য সমস্ত কিছু তৈরি করবে।
ধন্যবাদ Rauful Alam স্যার
বইটি পড়ার জন্য বলেছিলেন শ্রদ্ধেয় শাহাদাত স্যার। আর বইটি উপহার দিয়েছেন Shawkat Ali Tara মামা।
আপনার মন্তব্য লিখুন