আত্মতৃপ্তি


"আত্নতৃপ্তি"

 

বাসা থেকে বেরিয়েছি শহরে যাওয়ার জন্য, কয়েকশত গজ যাওয়ার পর মনে পড়লো মানি ব্যাগে টাকা নাই তো। 

কি করার ফিরে এলাম আবার আমার কহ্মে টাকা নেয়ার জন্য। এমনটি আগে খুব একটা হয় নি।  

শহরে যেতে হয় মূলত সিএনজি তে, বাস স্ট্যান্ড নেমে সাতমাথা যাবে সেই সিএনজিতে বসলাম। 

অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে আমার চোখে পড়লো একজন বৃদ্ধ মায়ের দিকে, বৃষ্টিতে ভিজা শরীরে, রাস্তার পাশে স্যাতস্যাতে একটা জায়গায় বসে ভিহ্মা করছে। 

সিএনজি চালক মামাকে বললাম, মামা আমার এখন যাওয়া হচ্ছে না। আপনি অন্য যাত্রী উঠান। 

 

খেয়াল করলাম চালক মামা একটু অসন্তুষ্ট হলেন। 

তবে আমি গুরুত্ব দিলাম না। 

আমার চোখ আটকে গেছে ঐ বৃদ্ধা মহিলার দিকে।

সারা রাস্তায় কাঁদা মাটিতে খুব খারাপ একটা অবস্থা, 

তার ওপর লকডাউন খুলে দেওয়ায় মানুষ আর যানবাহনের চাপ।  

ধীরে ধীরে এগিয়ে গেলাম মহিলার টার দিকে।  

কাছে গিয়ে প্রথমে একটু ইতস্ততভাব অনুভব হলো। 

কি বলবো কিভাবে বলবো বুঝতে পারছি না। 

 

তারপরও নিজের কনফিডেন্ট লেভেল আরো বাড়ালাম। 

পাশে দাঁড়িয়ে বললাম..... এই যে শুনছেন.... 

উনি খেয়াল করেন নি, দ্বিতীয়বার যখন সালাম দিলাম তখন উনি একটু আমার দিকে তাকালেন।  

তবে সালাম শুনে উনি মনে হয় একটু বিব্রতবোধ করলেন , মনে হলো সালাম দেয়া নেয়া সম্পর্কে আজকেই প্রথম পরিচয় তার।  

কারন আগে তো কেউ সালাম দেয় নি তাকে। 

আপনার সাথে কিছু কথা আছে একটু এই দিকে আসবেন? মানে এই দোকানের বারান্দায়...... 

জোর সরো কন্ঠে বললেন আমার সাথে কি কথা বাবা? 

 

আমি বললাম আসেন আগে তারপর বলছি। 

বৃদ্ধা মহিলা ঘুমটা টেনে বসে ছিলেন।  

জির্নশীর্ন শরীরে আস্তে আস্তে হেটে বারান্দায় এলেন। 

তারপর বললাম আপনি কী ওখানে ভিহ্মা করতে বসেছিলেন?  

বৃদ্ধা মহিলা উত্তর দিলেন হ্যা বাবা...... …

এরপর চেষ্টা করলাম তার ভিহ্মাবিত্তীর পেছনের ইতিহাস জানার জন্য। 

মহিলার নামঃ নাজমা বানু 

স্বামীঃ হারেস উদ্দিন 

বয়সঃ আনুমানিক ৭৮ 

ঠিকানাঃ গাবতলি ( এইটুকুই বলেছে) 

তবে ঠিকানা বিষয়ে জানিয়েছে কেউ যদি তাকে গাবতলির বাস স্ট্যান্ড পৌঁছে দেয় তাহলে সে নিজে নিজেই বাড়ি যেতে পারে। 

 

প্রথমে চোখে না পড়লেও কথোপকথনের এক পর্যায়ে লহ্ম্য করলাম তার বাম হাতে একটা বেশ হ্মত চিন্হ। হ্মত দেখে কৌতূহল হলো আমার যে, কিভাবে এতো বড় হ্মত হলো। 

জানতে চাইলাম সকালে কিছু খেয়েছে কিনা?  

বললো রুটি আর ভাজি খেয়েছে।  

এই দিকে শরীরটা পুরো ভিজা। 

সময় তখন দুপুর ২:৪০ মিঃ

 

তাকে বাস স্ট্যান্ডের ছোট একটা হোটেলে নিয়ে গেলাম 

এবং বললাম তৃপ্তিসহকারে খাবেন। 

বৃদ্ধা বলে.. বাবা তৃপ্তি করে আর কতোই খামু কও বয়স হছে, আর সিংকা খাবার পারি না। 

 

খেতে খেতে কিছু কথা শুনে নিলাম 

গাবতলিতে বাড়ি হলেও সে এই বাস স্ট্যান্ড এলাকায় থাকে প্রায় আড়ায় বছর হলে।

স্বামী মারা গেছে অনেক আগে।

বাড়িতে দুই ছেলে এক মেয়ে। মেয়ের বিয়ে হয়ে গেছে। সে এখন কোথায় থাকে তা সেই দুঃখিনি মা জানে না।

আর দুই ছেলে বিয়ে করে আলাদা৷ জমিজমা বলতে টিনের তিনটা ঘরের জায়গা টুকু। 

মাকে কুলাঙ্গার ছেলেরা এই শহরে রেখে চলে যায়। আর তাকে পালতে পারবে না।  

কিছু কিছু কথা দুইবার জিজ্ঞেস করতাম।  

এই জন্য যে সামনের তিনটা দাঁত নেই কথাগুলো অস্পষ্ট শুনাচ্ছিলো। 

সেই আড়ায় বছর ধরে এখানে আছে, মাঝখানে কিছুদিন সে বাসা বাড়িতে বূয়ার কাজ করতো।  

বয়সের ভারত্বে সেই কাজও আর করতে পারে না। 

তাই ভিহ্মা করে। 

জানতে চাইলাম হ্মত হলো কিভাবে?  

 

কান্না জরিত কন্ঠে জবাব দিলেন, ছেলেরা ধরে মারছিলো। শুনে ভাবলাম হায় আফসোস এমন ছেলেও আছে?......... 

আগে নিউজ পোর্টালগুলোতে এমন ঘটনার কথা শুনতাম। আজ নিজে সাহ্মী হলাম। 

আমি তাকে বললাম বাড়ি যেতে চান না?  

সে বলে এই বয়সে আর মার খামো না।

আছি আর কয় দিন। বেটারা ভালো থাকুক। খুব কাঁদতে লাগলেন। আমি বললাম কাদেন না। দুয়া করেন আল্লাহ তাদের হেদায়াত দান করুন।

এরপর তাকে কিছু জিনিস এবং খাবার কিনে দিয়ে বললাম এভাবে বৃষ্টিতে ভিজবেন না। অসুখ হলে কে দেখবে আপনাকে৷ উনি বলে যার কেউ নাই তার আল্লাহ আছে। দুয়া করি ভালো থাক বাবা। 

 

এমন অসংখ্য দুঃখিনী মা রাস্তায় রাস্তায় পড়ে আছে, যাদের দেখার মতো কেউ নাই। ছেলে মেয়ে খোঁজ খবর নেয় না। এমন অসহায় মানুষদের জন্য কাজ করতে ইচ্ছে করে। যে যখন যেমন ভাবে সুযোগ পাবেন তখনই মানবতার সেবায় নিজেকে শামিল করবেন।  

এমন অসহায় লোকদের পাশে দাঁড়ানো আমাদের নৈতিক ও ঈমানী দায়িত্ব। 

আল্লাহ আমাদের সবায়কে নিরাপদ, সুস্থ, অভাবমুক্ত, সুন্দর জীবন গঠন করার এবং সুন্দর জীবন উপহার দেয়ার তৌফিক দান করেন আমিন।

 

হাবিবুল্লাহ 

১২/০৮/২১

রাতঃ১২:২৪ মিঃ

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন