
মানুষ
রাস্তার পাশের দোকান থেকে পানির বোতল কিনলাম। ইফতারের আর পাঁচ মিনিট সময় বাকি৷ বাড়ি যেতে সময় লাগবে বিশ মিনিট৷ দোকানি দোকান বন্ধ করে পাশ কেটে চলে গেল। আশপাশটাও বেশ ফাঁকা। এই সময়ে বাইরে তেমন মানুষ জন থাকে না। দোকানগুলো প্রায় সবই বন্ধ। ব্যস্ত মানুষেরা বাড়ির পথে ছুটছে, প্রিয়জনদের সাথে ইফতার করার জন্য।
এই মুহূর্তে নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। আগে কখনোই রাস্তায় ইফতার করিনি বা এই সময়ে বাইরে থাকিনি।
" আপা, এখানে দাঁড়িয়ে না থেকে দোকানের ভেতরে আসেন। আজান দিতে তো বেশি সময় নেই। পাঁচ মিনিট আছে। আসেন।"
আমি পাশ ফিরে ছেলেটাকে দেখলাম। আমি যেই দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে তার থেকে দুই দোকান পরের খোলা দোকানের দিকে নির্দেশ করলো ছেলেটি। দোকানের নাম লক্ষ্মী মিষ্টান্ন ভান্ডার। হিন্দু দোকান। আমি ইতস্তত বোধ করছিলাম। হিন্দুদের দোকানে সন্ধ্যেবেলা সন্ধ্যার আরতি দেওয়া হয়, স্তুতি পাঠ করা হয়, সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বালা হয়। রোজা রেখে ওই দোকানে যাওয়া বোধহয় ঠিক হবে না। কিন্তু শরীর খুবই ক্লান্ত, কোথাও একটু বসা ভীষণ প্রয়োজন। ছেলেটির সাথে দোকানের দিকেই পা বাড়ালাম।
দোকানের ভেতরের ঠাকুর দেবতার মূর্তির উপর কাপড় দিয়ে ঢেকে রাখা। ছবিগুলোও ঢাকা। শুকনো ফুলগুলো বের হয়ে আছে। ভেতরে টিভিতে কোরআনের তর্জমা প্রচারিত হচ্ছিল। গোলাপজলের মিষ্টি একটা গন্ধ ছিল। মেঝের উপর বড়ো একটা মাদুর পাতা। একজন খুব মনোযোগের সাথে প্লেটের উপরে ছোলা মুড়ি সাজাচ্ছিল।
" আপা, আপনি এই জায়গাতে বসেন।"
আমি বসলাম। আমার চোখের সামনে সুন্দর করে ইফতার গুছানো হচ্ছে৷ গ্লাসে শরবত ঢালা হচ্ছে৷ ফ্রিজের ঠান্ডা পানির বোতলটা আমার সামনে রাখা হলো। এই দোকানের সবচেয়ে বয়স্ক ব্যক্তিটা আমাকে বললো, " আপনি একটু আমাদের জন্য দোয়া করেন। টিভিতে শুনেছি ইফতারের আগে দোয়া করলে দোয়া কবুল হয়।" আমি সবার দিকে তাকিয়ে ছিলাম। আস্তে আস্তে করে বললাম, "আচ্ছা, আমি দোয়া করছি।"
মসজিদে আজান দেওয়া হলো। ইফতারের প্লেট আর শরবতের গ্লাস আমার দিকে দেওয়া হলো। আমার মনে হলো অনেকদিন পর আমি তৃপ্তি নিয়ে ইফতার করলাম৷ সবার চোখেমুখে আনন্দ দেখে আমিও আনন্দিত হলাম।
"আপনাদের দোকানে কি কেউ মুসলমান আছে? এত সুন্দর করে আয়োজন করলেন, ভালো লেগেছে।"
" না, এই দোকানের সব কর্মচারীরাই হিন্দু। আমরা ইফতারের আয়োজন করি পথচারীদের জন্য। এখানের বেশিরভাগ দোকানের মালিকেরাই মুসলমান। আজানের আগেই তারা দোকান বন্ধ করে বাসায় যায়। পথচারীদের অনেকেই হয়তো কাজের জন্য আটকে যায়৷ আবার অনেক রিকশাওয়ালা ভাইয়েরা সারাদিন রোজা রাখে বাড়ি যেতে পারে না। তাদের যেন কিছু সাহায্য করতে পারি তাই করেছি। সারাদিন না খেয়ে থাকলে তো মানুষের কষ্ট হয়৷ আমরা খুব বেশি কিছু পারি না। তবুও চেষ্টা করি। তৃপ্তির মুখ দেখতে ভালো লাগে। আমার দোকানের ছেলেগুলোও খুব খুশি হয়।"
ইফতারের পর দোকানের একজন কর্মচারী আমাকে কিছু পথ এগিয়ে দিয়ে গেল।
আজকাল আমরা হিন্দু মুসলমানে ভাগ হয়ে গেছি৷ মানুষের পরিচয় ভুলে গিয়ে এখন ধর্মের পরিচয়টায় সামনে নিয়ে আসি৷ ধর্মের ভাগ নিয়ে নিজেদের মাঝে অশান্তি করি। অথচ মনুষ্যত্ববোধটা সবচেয়ে বেশি জরুরি। এই বোধটুকুই প্রতিটা ধর্ম আর ধর্মের মানুষকে সুন্দর চরিত্রের অধিকারী করে। ধর্ম ভেদাভেদ তৈরি করে না। ভেদাভেদ তৈরি করি আমরা মানুষেরাই। হিন্দু বা মুসলমান যে ধর্মের-ই হয়ে থাকি ভালো মানুষ হওয়াটা সবচেয়ে বেশি জরুরি।
আপনার মন্তব্য লিখুন