
জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল
তুমি না ভালবাসলেও ত্যাগ করতে পার, কিন্তু
ত্যাগ না করে কিছুতেই ভালবাসতে পার না!
ক'দিন আগেই ক্রিস ভলটোনের উক্তিটি পড়েছিলাম। কিন্তু আজ যখন ‘জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল’ বইটি পড়লাম, তখন ত্যাগ আর ভালবাসার সম্পর্কটি চির আপন বলেই আমার কাছে মনে হয়েছে। একজন মানুষ যিনি কি না হৃদয় দিয়ে ভালোবসেন তাঁর বিদ্যালয়কে। সীমাহীন মায়ায় জড়ানো ভালবাসার সুনিপুণ চিত্রটি ফুটে উঠেছে স্কুলের প্রতি তার মমত্ববোধের মাধ্যমে। তিনি আর কেউ নন, সেই স্কুলেরই প্রধান শিক্ষক জনাব ফজলুল করিম স্যার। হ্যাঁ আমি সেই জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুলের কথাই বলছি।
স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা জীবনকৃষ্ণ রায় খুব ধর্নাঢ্য ব্যাক্তি ছিলেন। পেশায় পেশকার হলেও ব্যবসা-বাণিজ্যে বিপুল সম্পদের মালিক ছিলেন। এত সম্পদশালী হলে স্বভাবতই মানুষের জীবন আড়ম্বরপূর্ণ হয়ে ওঠে, জীবনকৃষ্ণ বাবুও তার ব্যাতিক্রম ছিলেন না। কিন্তু তাঁর মনের আকস্মিক পরিবর্তন তাকে মানুষের আরও কাছাকাছি নিয়ে আসার সুযোগ করে দেয়। তিনি তার সকল সম্পদ দান করে দেন, প্রতিষ্ঠা করেন জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল।
বইয়ের শুরুর দিকটা কিছুটা হাস্যরসাত্মক হলেও মধ্যভাগে এসে বই থেকে চোখ ফেরানো কঠিন। আর শেষ অবধি গেলে সবচেয়ে কঠিন হৃদয়ের মানুষকেও হয়ত কাঁদিয়ে ফেলবে বলেই আমার বিশ্বাস। বইয়ের পুরো অংশ জুড়েই লেখক তার অনবদ্য ও শৈল্পিক লেখনি দিয়ে মুগ্ধতা ছড়িয়ে রেখেছেন যা সকল বয়সী পাঠকদের আকৃষ্ট করবে।
জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল প্রতিষ্ঠিত হবার পর থেকেই স্থানীয় বাজারের চাঁদা আর সামান্য কিছু সরকারি অনুদান নিয়েই চলে আসছিল প্রাচীন এই স্কুলের কার্যক্রম। নাম মাত্র বেতন আর একরাশ স্বপ্নের বুনন নিয়েই পথচলা ছিল স্কুলের শিক্ষকদের। সবাই স্বপ্ন দেখত স্কুলটি একদিন অনেক বড় হবে, নাম করবে, দুর দুরান্ত থেকে ছাত্ররা আসবে, ছাত্র-ছাত্রীদের পদচারনায় মুখরিত থাকবে স্কুলের আঙ্গিনা। সবার সেই স্বপ্নটিও পাখা মেলতে শুরু করেছিল এক বড় অনুদানের আশায়।কিন্তু অনেক স্বপ্নই যে অধরাই রয়ে যায় সেটি আবারও প্রমানিত হয় জীবনকৃষ্ণ হাইস্কুলের পাশেই মন্ত্রী মশাইয়ের আরেকটি হাইস্কুল প্রতিষ্ঠা করায়।
জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়ালের প্রধান শিক্ষক ফজলুল করিম স্যার প্রতিবাদ করলেও ক্ষমতা আর আধিপত্যের কাছে তার সহজ কথাগুলো সেদিন হেরে গিয়েছিল। হেডস্যার ফজলুল করিমের সমস্ত চিন্তা ভাবনার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল তার স্কুল। সীমাহীন ভালবাসা আর স্বপ্নে লালন করা স্কুলের জন্য নিজের সবকিছু দিয়েই স্কুলটিকে টিকিয়ে রাখতে চেয়েছিলেন। নিজের সততা আর দায়িত্ববোধ তাকে কখনে পিছপা করতে পারেনি। যুদ্ধের সময় পাক বাহিনীরা তাকে স্কুলে লাঞ্ছিত করলেও তিনি থেমে যান নি বরং আরও দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরেছেন স্বপ্নকে।
তাকে জড়িয়ে কুৎস রটালেও তিনি মনোবল হারাননি। ধীরে ধীরে অনেক শিক্ষক ও ছাত্ররা জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল ছেড়ে নীলগঞ্জ হাইস্কুলে চলে যেতে লাগল। ফজলুল করিম স্যার যেন শেষ প্রচেষ্ঠাটাই করলেন। স্কুলের আরবী শিক্ষক ইরতাজ উদ্দিন ও তারুণ্যে ভরপুর বিজ্ঞান শিক্ষক মামুন সাহেব যেন হেডস্যারের পাশে এসে পাহারের মত দাড়িয়ে গেলেন। স্যারদের তিন মাসের টানা পরিশ্রমে এসএসসিতে ভাল ফলাফল হল, স্কুলের একছাত্র মেধাতালিকায় ২য় হয়ে বোর্ড স্টান্ড করলেন।
স্যারেরা মেতে উঠলেন উৎসবে। চারদিকে ছড়িয়ে পড়ল সফলতার গান। আকাশে বাতাসে ধ্বনিত হতে লাগল জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুলের জয়গান। হেডস্যারের চোখের কোনা থেকে কয়েক ফোঁটা নোনাজল বেরিয়ে এলো খুশিতে। কিন্তু এই আনন্দে কেবল শামিল হতে পারল না হেডস্যারের মেয়েতুল্য রেশমি। মায়াবী আর অভিমানী মেয়েটাকে যে চলে যেতেই হবে, তানাহলে কুৎসিত মানুষগুলো তো থেমে থাকবে না। রেশমি ছুটে চলল হেডস্যারকে রেখে, যাবার সময় জলচৌকির উপর রেখে গেল স্যারের জন্য পা ধোয়ার স্বচ্ছ জল, যে জলেই হয়ত ধুয়ে মুছে যাবে সকল মিথ্যাচার, আবারো নতুন আলোয় ভরে উঠবে জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল।
* বইয়ের নাম: জীবনকৃষ্ণ মেমোরিয়াল হাইস্কুল
* লেখক: হুমায়ূন আহমেদ
* প্রকাশনায়: অনন্যা পাবলিশার্স
* মুদ্রিত মুল্য: ১৫০/-
* পৃষ্ঠা সংখ্যা: ৭৯
আপনার মন্তব্য লিখুন