আমার দেখা আমার গ্রাম


সেই গ্রাম সেই বাড়ি, বাড়ির পিছনে প্রিয় আম, জাম, নারকেল গাছ সবই আছে। নেই শুধু সেই মুখগুলো। যে মুখের তাগিদে বার বার ছোটে যেতে ইচ্ছে করতো আমার প্রাণ ভোমরা আটকে আছে যে কুঠুরিতে, সেই কুঠুরিতে। কালের সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে পথের ধারে সেই বন্না গাছটি। মতিন মামার গ্রামে গিয়ে কবিতা আবৃত্তির ভিডিও গুলো দেখার পর আমার ভিতরটা হু হু করে কেদে উঠলো। বাড়ীর পাশে বুলিটাও দেখলাম।যেখানে বর্ষার নতুন পানিতে বাড়ির বউ-ঝিরা, ছোট ছোট ছেলে-মেয়েরা জলকেলিতে মেতে উঠতো।সেই পানিতে আমিও যে কতবার দাপাদাপি করেছি, কোষা নাও নিয়ে বিল থেকে শাপলাও তুলেছি।আহা! কোথায় হারিয়ে গেল আমার সেই নির্মল আবহে বেড়ে ওঠা সোনালী শৈশব। যে শৈশবকে মনে করে আজও আনন্দে ভাসে আমার হৃদয় মন।আসলে শৈশব আর কৈশোরের মত এত নির্মল,স্বচ্ছ, পবিত্র আনন্দঘন মুহূর্ত মনে হয় জীবনর আর কোনো পরতে আসে না।

কত বছর হয়ে গেল শুনি না সেই মধুমাখা কন্ঠে আকুতি-বিকুতি--"কি রে বাজান, আমার নাতিদের নিয়ে বাড়ি আসবি না। কতদিন হয়ে গেল তোদের দেখিনা বাজান।" আহা! কত বছর হয়ে গেল দাদীর বুকের গন্ধ পাই না। দাদী গত হয়েছেন প্রায় ১৪ বছর হতে চললো। উনি চলে যাওয়ার সাথে সাথে আমার সেই শখের বাড়ি, সখের মানুষজন,নদী-খাল, গাছপালা সবাই যেন পর হয়ে গেল।

ছোট বেলায় আমার দেখা গ্রাম আর গ্রাম নেই। পুরো দেশ যখন পরিবর্তনের জোয়ারে ভাসছে, তখন আমার গ্রাম কেন পিছিয়ে থাকবে। সময়ের পালাবদলে আমার শখের গ্রামেও লেগেছে পরিবর্তনের হাওয়া। পরিবর্তনের হাওয়ায় দুলতে দুলতে গ্রামের প্রতিটা বাড়িতে হ্যারিকেন আর কূপির পরিবর্তে বৈদ্যুতিক আলোর ঝলকানি। রাস্তাঘাটেও এসেছে পরিবর্তন। সেই দুইপাশে অবারিত ফসলের মাঠ আর মাঝখানে পায়ে চলা মেঠোপথ আর চোখে পড়ে না। তার বদলে জায়গা করে নিয়েছে আধাপাকা রাস্তা, তার উপর দোকানপাট আর বসতি। যে রাস্তা দিয়ে আমরা মনের আনন্দে দুলতে দুলতে হেটে এক গ্রাম থেকে আরেক গ্রামে যেতাম, সেখানে আজ নিশ্চিন্তে হাটার আর সুযোগ কোথায়? রাস্তা দখল করে আছে ব্যাটারি চালিত অটোরিকশা।হাঁটার সময় একটু বেখাল হলেই নির্ঘাত দুর্ঘটনা। আগে গ্রামগুলোতে যেমন নির্জন দুপুরে ঝিরিঝিরি বাতাস আর পাখির কুহুতানে মুখরিত থাকত, সেখানে আজ পেট্রলের গন্ধ আর ভটভটির ঝাঝালো শব্দে নির্জন দুপুরকে খান খান করে দেয়।

বাড়ির পাশে সেই বুলি বা বিলের কথা যদি বলি, সেখানেও এসেছে পরিবর্তন। আমার দেখা সেই বুলি, যেখানে বর্ষার পানিতে পরিপূর্ণ হয়ে যেতো। ফসলের মাঠগুলো ডুবে গিয়ে সেখানে জায়গা করে নিতো আমাদের জাতীয় ফুল শাপলা, শালুক,কচুরিপানা দল,আর নতুন পানিতে মনের আনন্দে মাছেরা ডিম পেড়ে তাদের বংশবৃদ্ধি করতো,সেখানে আজ জায়গায় জায়গায় গড়ে ওঠেছে মানুষের বসতি। জনসংখ্যা বৃদ্ধি বা বংশবৃদ্ধির কারনে মূল বাড়িতে জায়গার অভাবে অনেকে ফসিল জমিতে গড়ে তুলেছেন তাদের মাথা গোঁজার ঠাঁই। এখন আর দিগন্ত বিস্তৃত অবারিত সবুজ বা হলুদে ছেয়ে থাকা চোখ জুড়ানো সেই অপরুপ দৃশ্য দেখে চোখ জুড়ায় না। ফসলের মাঠে জায়গায় জায়গায় গড়ে ওঠা বসতবাড়ি। শরীরের বিভিন্ন অংশে বিষফোঁড়া যেমন শারিরীক সৌন্দর্য নষ্ট করে, আমার কাছে মনে হয়েছে ফসলি জমিতে গড়ে ওঠা ঐ বসতবাড়িগুলোও মাঠের সৌন্দর্য নষ্ট করেছে।

গ্রামের প্রতিটি বাড়িতেও পরিবর্তনের ছোঁয়ায় টিনের ঘরের পরিবর্তে স্হান করে নিয়েছে ইট পাথরের গাঁথুনি দেয়া শহর আঙ্গিকে বাহারি নকশায় একতলা দুতলাবিশিষ্ট পাকাবাড়ি। গ্রামের সেই ঐতিহ্যের ধারক টিন আর কাঠের তৈরির সারি সারি দুচালা চৌচালা ঘরগুলো প্রায় বিলুপ্তির পথে। শহরের আঙ্গিকে শুধু বাড়ির অবকাঠামো গুলোই পরিবর্তন হয়নি সেই সাথে বাড়ির- ঘরের আসবাবপত্র, পোষাক-আষাক,খাবার- দাবারে এসেছে আমূল পরিবর্তন। বেশির ভাগ বাড়িতেই সিলিন্ডার গ্যাসে রান্না হয়। চিরচেনা সেই নারার আগুনে হাত পুড়িয়ে রান্না আর সেই রান্নার অমৃতস্বাদ বিলুপ্তির পথে। রান্নায় ব্যবহৃত বাটনা মশলাও দেখা যায় না। প্রত্যেকটা বাড়িতে এখন মেশিনে গুড়ো করা মশলা বেশি হয়।

পরিবর্তনের ভালো দিকগুলোর মধ্যে যে দিকটি বেশি চোখে পড়ে তাহলো - শিক্ষার হার খুব বেড়েছে। ছেলে শিক্ষার পাশাপাশি মেয়েরাও সমান তালে এগিয়ে চলেছে। গ্রাম গুলোতে বাল্যবিবাহের হার অনেকটাই কমে গিয়েছে।

একসময় আমাদের গ্রামে সপ্তাহে একবার হাট বসতো।পুরো সপ্তাহের বাজার ঐ হাটের দিন করতে হতো।বাড়িতে মেহমান আসলে ঘরে পালা মুরগী - ডিম দিয়ে বাড়িতে লাগানো সবজি দিয়ে কাজ সারতে হতো। পরিবর্তনের ছোঁয়ায় আমাদের বাজারগুলো এখন বেশ জমজমাট। আধুনিক জীবনের প্রয়োজনীয় সামগ্রি পাওয়া যায় এখানে যেকোনো সময়। এখন আর গ্রামের মানুষকে কেনাকাটা করতে দূরের গন্ঞ্জে যেতে হয় না।

বিভিন্ন আচার-অনুষ্ঠানও এসেছে পরিবর্তন। বর্ষাকালে আমাদের গ্রামে খুব অনুষ্ঠান হতো। গ্রামগুলো যেহেতু কৃষি নির্ভর তাই বর্ষাকালে তেমন কাজ নেই বললেই চলে। এসময় গ্রামের মানুষ বিয়ে শাদী, সুন্নতে খতনা, ওয়াজ-মাহফিল, জারিসারি গানের আসরে মেতে উঠেন। আগে বিয়ের অনুষ্ঠানে হরেক রকমের পিঠা ও মিষ্টির পদ থাকতো। ঝাল আইটেমের আগে এতো পিঠা মিষ্টি খাওয়ানো হতো যে, পিঠা খেতে খেতেই পেট ভরে যেত। তখনকার দিনে পিঠা মিষ্টি ছাড়া বিয়ে বাড়ি কল্পনাই করা যতো না। পিঠা মিষ্টির আয়োজনেই বিয়ে বাড়ির আভিজাত্য প্রকাশ পেত। বিয়ের আয়োজন চলতো সপ্তাহ সপ্তাহ ধরে। এখন বিয়ে শাদীতে পিঠাপুলির আয়োজন দেখা যায় না। শহরের মত নির্দিষ্ট কিছু আইটেমই সারছেন বিয়ের আয়োজন।

শহরের মানুষ নিজস্ব সংস্কৃতি নিজস্ব ঐতিহ্যকে ভুলে পাশ্চাত্যের আবহে নিজেকে তুলে ধরে আভিজাত্যের প্রকাশ মনে করছে, ঠিক তেমনি ভাবে গ্রামগুলোও যেন তার চিরচেনা রুপ,সৌন্দর্য, সরলতাকে পরিত্যাগ করে শহরের কঠিনতাকে আকড়ে ধরার এক নির্মম খেলায় মেতে উঠেছেন।

ছোট বেলায় আমার দেখা প্রাকৃতিক সৌন্দর্য্যের লীলাভূমি ছায়া ঢাকা, পাখি ডাকা শান্ত সুনিবিড় আমার স্বর্গ ভূমি। এ গ্রাম আমাকে শিখিয়েছে কিভাবে দুহাত প্রসারিত করে বুক ভরে শ্বাস নিতে হয়। শিখিয়েছে কিভাবে ডুব সাঁতরে নদী পার হতে হয়। কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে প্রতিবাদ করতে হয়।আবার এই গ্রামই শিখিয়েছে কিভাবে ভালোমন্দ খাবার ভাগাভাগি করে খেতে হয়। শিখিয়েছে সুখের দিনগুলো যেমন একে অন্যের সাথে উপভোগ করতে হয় তেমনি দুখের দিনেও কিভাবে দুখীর পাশে দাঁড়াতে হয়। গ্রামকে খুব ভালোবাসি, যদি ও গ্রামে যাওয়া হয় খুব কম।তবু্ও আমার দেখা আমার গ্রাম, আমার সোনালী শৈশবকে আমি আজিবন লালন করবো আমার হৃদয়ে।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন