
একদিনের সফরে নাপিত্তাছড়া
২০১৬-১৭ এর দিকে ভ্রমণপ্রেমীদের কাছে খুব বেশি উচ্চারিত দুইটি নাম হলো খৈয়াছড়া ও নাপিত্তাছড়া। অল্প সময়ে ও কম খরচে কোথায় ঘুরে আসা যায় তার তালিকা করা হলে এই দুটি ঝর্ণার নাম থাকবে উপরের দিকেই। সেই সাথে পাশাপাশি হওয়ার ফলে এক ঢিলে দুই পাখি অর্থাৎ এক ট্যুরে দুইটি ঝর্ণা দেখার সুযোগ অনেকেই লুফে নিলো।
দুইটি ঝর্ণার মধ্যে খৈয়াছড়া তুলনামূলক কঠিন ও সম্পূর্ণ শেষ করা নতুন ট্র্যাকারদের জন্য একটু কষ্টসাধ্যই কিন্তু সেই তুলনায় নাপিত্তাছড়া বেশ সহজ। তাই যারা নতুন নতুন ঝর্ণায় যাওয়া শুরু করেছেন তাদের বেশিরভাগেরই শুরুটা নাপিত্তাছড়া দিয়ে।
নাপিত্তাছড়া যাতায়াত খুবই সহজ। ঢাকা থেকে প্রায় সারাদিনই ফেনীর বাস পাওয়া যায়, বাসের ভাড়া ২৭০ টাকা। বাসে ৫/৫.৩০ ঘন্টা মতো সময় লাগে। ফেনীতে নেমে সেখান থেকে মহিপাল চলে যেতে হবে সি এন জি বা টমটমে চড়ে। মহিপাল থেকে চিটাগাং বা মিরসরাইগামী বাসে চড়ে বসতে হবে। নামতে হবে ন দুয়ারহাটে। সেখান থেকে হাঁটা শুরু।
এছাড়া আরো কম খরচে যেতে চাইলে কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন থেকে রাত ১০.৩০-এর চিটাগাং মেইলে উঠে ভোরে ভোরে পৌঁছে যাবেন ফেনী জাংশনে। ঢাকা থেকে ফেনীর ভাড়া সর্বোচ্চ ১০০ টাকা। তবে ট্রেনে সিট যে পাবেন তার কিন্তু নিশ্চয়তা নেই। ট্রেন থেকে নেমে পূর্বে উল্লেখিত রুট ফলো করতে পারেন আর যদি বাজেট ট্যুর দিতেই চান তাহলে অপেক্ষা করুন ডেমো ট্রেনের। ২০ টাকার টিকিট কেটে ফেলুন ডেমো ট্রেন আসার আগেই। ঠিক ৭.২০ এ ট্রেন এসে যাবে ফেনী জাংশনে, থামবে মাত্র ১/২ মিনিট, এর মধ্যেই ভীড় ঠেলে উঠতে হবে ট্রেনে। যেহেতু বাজেট ট্যুর পরিশ্রমের চিন্তা করেই আগাতে হবে। প্রায় আধাঘন্টা পর নামবেন বড় দারোগা স্টেশনে। ট্রেন থেকে নেমে হাতের বামের রাস্তা চলে গিয়েছে খৈয়াছড়া ঝর্ণার দিকে আর ডানের রাস্তা নাপিত্তাছড়ার দিকে।
নাপিত্তাছড়া ট্রেইলে ঝর্ণা আছে মোট ৪টা। ঝর্ণা গুলো হলো-কুপিকাটাকুম, মিঠাছড়ি,বাঘবিয়ানী এবং বান্দরকুম বা বান্দরিছড়া। আর এই ঝর্ণাগুলো যাওয়ার ঝিরিপথটাই হলো নাপিত্তাছড়া ট্রেইল।
তো হাঁটা শুরু করলে প্রথমে পাবেন ইটের রাস্তা এরপর মাটির কাঁচা রাস্তা। হাটার সময় দ্বিধায় পড়লে সেখানকার স্থানীয় কাউকে জিজ্ঞাসা করলেই হবে। কিছুদূর হেঁটে রেললাইনের পাশে কিছু দোকান পাবেন সেখান থেকে শুকনো খাবার কিনে নিতে পারেন আর দুপুরের খাবারের অর্ডার দিয়ে আপনার প্রয়োজনীয় জিনিসছাড়া বাকি জিনিসপত্র সেই দোকানে রেখে যেতে পারেন। এখান থেকে চাইলে আপনার গাইড নিতে পারেন আবার নিজেও যেতে পারেন।
গ্রামের পথ ছেড়ে এবার ঝিরিপথে যাত্রা শুরু। বর্ষাকাল হলে অবশ্যই সতর্ক থাকতে হবে কারণ কোন সময় যে পানির স্রোত বেড়ে যাবে বুঝতেও পারবেন না। বেশ কিছু সময় ট্রাকিং করে গেলে দেখা পাবেন প্রথম ঝর্না অর্থাৎ কুপিকাটাকুমের। এই ঝর্ণাটিকে অনেকটা দোতালা ঝর্ণা বলা যায়।
এরপর একে একে সামনে এগিয়ে বাকি ঝর্ণাগুলোও পেয়ে যাবেন। অন্য ট্রেইল থেকে নাপিত্তাছড়া তুলনামূলক সহজ হওয়ার ফলে অল্প সময়েই শেষ ঝর্ণা অর্থাৎ বান্দরিছড়াতে পৌঁছে যেতে পারবেন। চারটি ঝর্ণার প্রতিটির সৌন্দর্য আলাদা। নিজস্ব রুপে সেজে থাকে ঝর্ণাগুলো।
যেভাবে গিয়েছেন সেই পথ ধরেই ফিরে আসবেন। সব মিলিয়ে ৪ ঘন্টা মতো লাগবে সবকিছু ঘুরে দেখে আসতে। যেই দোকানে খাবারের অর্ডার দিয়ে গিয়েছিলেন সেখান থেকে ভেজা কাপড় বদলিয়ে দুপুরের খাবার খেয়ে বেরিয়ে যেতে পারেন।
হাতে সময়, শক্তি ও সাহস থাকলে একইদিনে ঘুরে আসতে পারেন খৈয়াছড়া আর তা না হলে দুপুর আর বিকেলটা কাটাতে পারেন বাঁশবাড়িয়া বা গুলিখালী সৈকতে কিংবা মহামায়া লেকে।
বিকাল বা সন্ধ্যার ন দুয়ারি বাস স্ট্যান্ড থেকে মহিপাল, সেখান থেকে ফেনী এসে বাসে চড়ে রাতের মধ্যেই ফিরে আসতে পারবেন আপনার গন্তব্যে।
ঝর্ণার প্রকৃত সৌন্দর্য উপভোগ করা যায় বর্ষাকালে। সেই সময়টা ঝর্ণার পূর্ণ যৌবন। কিন্তু একইসাথে ট্রেইলগুলো হয়ে ওঠে বিপজ্জনক। তাই নিজের সতর্কতার কথা আগে মাথায় রাখবেন সেই সাথে আপনার অভিজ্ঞতা, শক্তি ও সাহসের উপর নির্ভর করে উপভোগ করবেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যকে।
কোথাও বেড়াতে গেলে অবশ্যই ময়লা-আবর্জনা ফেলে নোংরা করবেন না। আমাদের দেশ আমাদেরই পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে।
আপনার মন্তব্য লিখুন