ইঁদুরের জবানবন্দী


‘যাহা বলিব সত্য বলিব’ এই শপথ করাতে যাওয়া মাত্র কাঠগড়ায় দাঁড়ানো ঢাঁউস আকারের ইঁদুরটা বলে উঠল-

-আমার অপরাধ?

-আমি তো বলিনি তুমি অপরাধ করেছ?

-তাহলে আমি বন্দী কেন?

-তোমাকে তো বন্দী করা হয়নি!

-লোভ দেখিয়েছেন।

-লোভে পাপ পাপে..

-পানিতে চুবিয়ে মৃত্যুদণ্ড।

-বাহ! তোমার তো দেখছি আইনকানুন ভালোই জানা!

-পাপ তো আপনিও করেছেন।

-মানে?

-শক্ত টোস্ট দিয়ে লোভ দেখিয়েছেন। খেতেও পারিনি। কেবল ছুঁয়েছি। অমনি কপাট পড়ল ঝপাস করে।

-প্যাকেট কেটে টোস্ট খেয়েছ তুমি। আমার খাবার নষ্ট করেছ।

-খাদ্য আমারও মৌলিক অধিকার।

-বই কেটেছ কুটিকুটি করে।

-কাটাকুটি আমার পেশা।

-তরকারির পাতিল ঘাঁটাঘাঁটি করেছ।

-ঘাঁটাঘাঁটি আমার নেশা।

-নেশা করা অপরাধ।

-সে অপরাধে কী ফাঁসি হয়?

-প্রিয় বিছানার চাঁদর কুচিকুচি করেছ।

-প্রমাণ আছে?

-তুমি বলেছ কাটাকুটি তোমার পেশা।

-পেশাগত দায়িত্বপালনের জন্য কি আমার ফাঁসি হতে পারে?

-আমাদের আইনে সব অপরাধের ওই একই শাস্তি। ধরা পড়লেই মৃত্যুদণ্ড। ফেরারী হয়ে পালিয়ে থাক। কোনো সমস্যা নেই। কারাগারে আসাই তোমার চূড়ান্ত অপরাধ। যার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

-পানিতে চুবিয়ে মারবেন না প্লিজ। দম বন্ধ হয়ে আসে।

-সবধরণের মৃত্যুতেই কষ্ট আছে।

-পানিতে চুবানোর কথা মনে আসলেই শ্বাসকষ্ট শুরু হয়ে যায়। সুইসাইড করতে মনচায় তখন। প্লিজ অন্য কোনো উপায়ে মৃত্যুদণ্ড দেন।

-অন্য উপায়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো লজিস্টিক সাপোর্ট আমার নেই।

-আমি নির্দোষ।

আমি এক রকমের ধাক্কা খেলাম। আসলেই যদি নির্দোষ হয়। কাপড় তো অন্য ইঁদুরও কাটতে পারে। টোস্ট তো অন্য ইঁদুরও খেতে পারে! কারাগারে তো এসেছে খাবারের লোভে। ক্ষিধার জ্বালায়। খাবার চুরির অপরাধে ফাঁসি দেব! একটু মনখারাপ হয়ে গেল। পাতাবিহীন পুঁই গাছের দিকে তাকিয়ে মন শক্ত করলাম। পাতাগুলো ওই সাবাড় করেছে। ও না করলে ওর বউ করেছে। ছেলেপুলেদের নিয়ে উল্লাস করে খেয়েছে। আমি যেন হালে পানি পেলাম। বললাম-

‘নির্দোষ নও তুমি। কারাগারে ঢোকাও তোমার অপরাধ।

-লোভ দেখালেন কেন?

-লোভে পড়ার অপরাধে ক্যাপিটাল পানিশমেন্ট হবে।

-লোভ তো সবাই করে। দশ হাজার টাকার নৌকার বিল করে বিশ লাখ। সেটা কি লোভ নয়!

-তুমি এত কিছু জানলে কী করে?

-সংসদ ভবন এলাকায় থাকা আমার ইঁদুর বন্ধু জানিয়েছে। রাতের গভীরে সেই নৌকায় সে অভিসারে যায়।

-বাহ!

-আমাকে মুক্তি দেন।

-মুক্তি তোমার হবে। ভেজা শরীরে।

-জীবিত মুক্তি।

-জীবিত অবস্থায় আমাদের কারোই মুক্তি নেই। মাছ বন্দী জলে, মানুষ বন্দী ছলে। নিরীহ বন্দী বলে, মালা বন্দী গলে। ভোটার বন্দী দলে, দর্শক বন্দী হলে।

-আমি বন্দী খাঁচায়।

-কে তোমাকে বাঁচায়!

-ফায়ারিং স্কোয়াডে দিন আমায়। পানিতে চুবিয়ে মারবেন না। আমি সাঁতার জানি না।

-তোমার গুলিবিদ্ধ দেহ পরিবার সইতে পারবে না। এত নির্মমতা হতে দেব না।

-আমার শেষ ইচ্ছা পুরন করবেন না?

-তোমার শেষ ইচ্ছা কী?

-মুক্তি।

-দারুণ তোমার যুক্তি। কিন্তু তোমায় মুক্তি দিলে আবার কাটবে সোফার কুশন। হ্যান্ড পেইন্টেড বিছানার চাঁদর। সারা ঘরময় হাঁটাহাঁটি, ঘাঁটাঘাঁটি। না, না মুক্তি তোমার হবে না। অন্য কোনো ইচ্ছার কথা বল।

-কারাগারের দরজাটা একটু মেলে ধরবেন? বুক ভরে নিঃশ্বাস নেব। শেষবারের মতো।

-পালানোর মতলব?

-আমাকে মারলে ছেলেপেলে বউ না খেয়ে মরবে তো!

-তারাও কাটাকুটিবিদ‍্যা রপ্ত করেছে। কর্ম করেই খেত পারবে ।

-তার মানে আপনি কাটাকুটিবিদ্যার স্বীকৃতি দিচ্ছেন! তাহলে তো আমি অপরাধ করিনি।

ইঁদুরটা কারাগারময় অস্থীর পায়চারি শুরু করল। শিক কাটার চেষ্টা করল। কিচিরমিচির ভাষায় চিৎকার করে সাহায্য চাইল। কিন্তু আমার আদালতে রায় একটিই। ধরা পড়লেই মৃত্যুদণ্ড। বের হওয়ার সকল চেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার পর অনেকটাই ক্লান্ত হয়ে পড়ল কেজি খানেক ওজনের ঢাঁউস ইঁদুরটা। ফিসফিস করে বলল,

-আমি নির্দোষ, আমি নির্দোষ।

-পরম যতনে হাতের কাজ করা বালিশের কভার কুচিকুচি করেছ। ফুলতোলা সোফার কুশনে আঁকিবুকি করেছ। নিপুণভাবে কেটেছো গৃহিনীর হৃদয়টাও। তোমার ক্ষমা নেই। তোমার ক্ষমা নেই।

-আমি সুইসাইড করব।

-লাভ কি তাতে? ফলাফল তো একই।

-আমি সংসদভবন এলাকার বান্দবীর সাথে দেখা করব। এটা আমার শেষ ইচ্ছা ।

-আচ্ছা তোমার বউয়ের মাধ্যমে খবর পাঠাচ্ছি।

-না! না! না! ভুলেও ও কাজ করবেন না। আমাকে গলা টিপে মেরে ফেলবে।

-তাহলে শেষ ইচ্ছা বাদ।

-কোনো সাক্ষী প্রমাণ ছাড়াই মৃত্যুদণ্ড দেবেন?

-আমার কোটে বল। তাই ইচ্ছামতো খেলব। তোমার কোটে যখন থাকে, তখন তোমার ইচ্ছামতো খেলো। খেলার এটাই তো নিয়ম।

-আমাকে ছেড়ে দিন প্লিজ।

আমি আর কাটব না

তরকারি ঘাঁটব না

ঘরময় হাঁটব না

জিভ দিয়ে চাটব না।

- ছড়া কাটতেও জান?

-বললাম না কাটাকুটি আমার পেশা।

-আর কী কী কাটো?

ইঁদুর বলল,

ধান কাটি পান কাটি

কাপড়ের থান কাটি

আরো কাটি আরো কাটি

পুতুলের কান কাটি।

জাল কাটি চাল কাটি

পুঁই ডাটা ছাল কাটি

কাঁচা পাকা ঝাল কাটি

ঘাসে ঢাকা আল কাটি।

বই ঘাঁটি দই ঘাঁটি

তেলেভাজা কই ঘাঁটি

গাছেওঠা মই ঘাঁটি

গুড়মাখা খই ঘাঁটি।

-কাটাকুটির তালিকা তো অনেক দীর্ঘ। নিজের জবানবন্দীতে নিজেই ফেঁসে গেলে। কী আর করা! বালতি ভরা হয়েছে পানিতে। মৃত্যু নিশ্চিত না হওয়া অবধি তোমাকে পানিতে চুবিয়ে রাখা হবে।

অবশেষে এক রাতে পানিতে চুবিয়ে মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হল। বাঁচার সকল আকুতি তার হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা মানবিক জল্লাদ কিছুটা বিপর্যস্ত। আইনের পাতা ঘেঁটে ঘেঁটে ইথিক্যাল বেইজ পাওয়ার পর কিছুটা শান্ত হয়েছেন।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন