
ঘুম ভেঙে দেখি আমরা কচ্ছপ হয়ে গেছি
এক সকালে ঘুম ভেঙে দেখি আমরা কচ্ছপ হয়ে গেছি। আমরা মানে দেশের তিন ভাগের দুইভাগ মানুষ। শক্ত খোলসের ভেতর আমাদের শরীর। বুকে ভর দিয়ে থপথপ করে হাঁটি। খোলসের তল দিয়ে পিঠে হাত দিয়ে পরখ করে দেখি মেরুদণ্ড আছে কি না। মেরুদণ্ড আছে ঠিকই, কিন্তু সেটা দিয়ে কোনোভাবেই সোজা হতে পারছি না। বুকে ভর দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে সরিসৃপের মতো। আমরা কেন কচ্ছপ হলাম, কিভাবেই বা হলাম--তার ইতিবৃত্ত কিছুই জানি না। কখন এই বিবর্তন ঘটে গেছে টেরই পেলাম না।
খোলসাবৃত ভারী শরীর নিয়ে বাইরে বের হলাম। চারদিকে আমার মতো খোলসওয়ালা কচ্ছপ। বুকে ভর দিয়ে হাঁটছে। বাজার করছে। টং দোকানে চা খাচ্ছে। দিব্যি হেসে খেলে বেড়ানো কচ্ছপগুলোর মধ্যে কোনো আক্ষেপ নেই। কচ্ছপ হওয়াটা যেন খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। সেই ভিড়ে আমিও আছি। খোলস ছাড়াও আরেকটি পরিবর্তন লক্ষ্য করলাম নিজের মধ্যে। মাথা ঢোকানো ও বের করা। একটা সময় আমরা কুকুরের লেজে বেঁধে বাজি ফোটাতে দ্বিধা করতাম না, সেই আমরা আজ কুকুরের ডাক শুনেই মাথা ভেতরে নিয়ে ঘাপটি মেরে বসে থাকি।
হঠাৎ করে এই কচ্ছপ হওয়া নিয়ে যতটুকু আক্ষেপ ও মনোকষ্ট ছিল তার পুরোটাই উবে গেল, যখন দেখলাম আমাদের কেউ কেউ শামুক হয়ে গেছে। মাথার উপর দুটি এন্টেনা নিয়ে পা টেনে টেনে হেঁটে যাচ্ছে। সাধারণ পাতা ঝরার আওয়াজেও মুখে খিল এঁটে রাস্তায়ই বসে থাকে। বুলেট তো নস্যি, বোমা মারলেও সে মুখ খুলবে না। রোদের উত্তাপে খোলস গলে চুন হয়ে যাবে, মুখ তবু খুলবে না। শামুকের তুলনায় কচ্ছপের মর্যাদা কিছু বেশি তো অবশ্যই হবে, সেটা ভেবেই আনন্দে দিন কেটে যায়।
আমাদের কচ্ছপ হওয়ার খবরে হৈচৈ লেগে গেল কচ্ছপ সমাজে। কপালের বলিরেখা প্রকট হয়ে উঠল কচ্ছপ নেতাদের। জাতীয় কচ্ছপ শুমারির হিসাবে গোলমাল বেঁধে গেল। সবার মনেই একটা প্রশ্ন--এত কচ্ছপের আগমন কোথা থেকে? নেতারা বসল শলাপরামর্শে। রুদ্ধদ্বার বৈঠক। জলে কচ্ছপ, স্থলে কচ্ছপ। এত কচ্ছপ ডিম পাড়বে কোথায়? খাবে-ই বা কী? এসব নিয়ে বিস্তর আলোচনা হলো। রহস্য উদঘাটনে মাঠে নেমে গেল গোয়েন্দা কচ্ছপ দল। গোয়েন্দাদের একটি দল এক সন্ধ্যায় আমাকে তুলে নিয়ে গেল তাদের প্রধান কার্যালয়ে। সমুদ্রের তীরে একটি ঝোপে তাদের কার্যালয়। ফুটবলের মতো দাগকাটা পোশাক পড়া গোয়েন্দা অফিসার এসে আমাকে বলল, মাথা বের করুন। আমি মাথা বের করতেই সে বলল, আপনাকে প্রমাণ দিতে হবে আপনি আসলেই কচ্ছপ কি না।
আমি বললাম, আমাকে কী করতে হবে?
- ডিম পেড়ে দেখাতে হবে।
-হাঁসের ডিম, না মুরগির ডিম?
আমার কথা শুনে কচ্ছপ গোয়েন্দারা হো হো করে হেসে উঠল। নেতা গোছের একজন এসে বলল, তাইলে আপনি কচ্ছপ না। হুদ্দাই ভেক ধরে আমাদের ভাত নষ্ট করছেন। আপনার এখন কচ্ছপাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগে ঝোপ মার্শাল হবে।
আমি পড়লাম আচ্ছা মুশকিলে। নিজেই তো জানিনা কিভাবে কচ্ছপ হলাম। এখন ডিম পেড়ে প্রমাণ করতে হবে? সেও কি সম্ভব। কিভাবে এদের হাত থেকে বাঁচা যায়! ঝট করে মাথায় বুদ্ধি এল একটা। আমি প্রশ্নকারী গোয়েন্দাকে বললাম, আপনি ডিম পেড়ে দেখান তো। না পারলে আপনিও কচ্ছপ না।
ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গোয়েন্দা কচ্ছপ বলল, আ-আ-মি ডিম পাড়ব? আ-আ-মি তো পুরুষ কচ্ছপ।
এবার যেন হালে পানি পেলাম। দুই পা এগিয়ে মাথা বের করে জোর গলায় বললাম, আমিও যে পুরুষ কচ্ছপ সেটা প্রমাণ করতে কি খোলস……...।
-না, না, না। থাক থাক। আপনি যেতে পারেন।
আমি সসম্মানে কচ্ছপদের গোয়েন্দা কার্যালয় থেকে বাড়ি চলে এলাম। ছোট মাছের চচ্চরি দিয়ে গাপুস গুপুস ক’টা খেয়ে সোফায় গা এলিয়ে টিভি অন করলাম। ওমা! টিভিতে খবর পাঠ করছে উন্নত প্রজাতির হাইব্রিড কাছিম। খবরের বিষয় হলো-আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আমাদের গর্বিত উপস্থিতি। আলজাজিরা, বিবিসি, সিএনএনসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া তোলপাড় করা খবর একটাই--কোটি কোটি মানুষের কচ্ছপ হওয়ার ইতিবৃত্ত। দেখানো হলো-কচ্ছপ হয়েও কিভাবে সুখে দিন পার করছে সদ্য কচ্ছপ হওয়া মানুষের দল। আমাদের গর্বে বুক ভরে গেল।
খবর দেখে নড়েচড়ে বসল আন্তর্জাতিক কচ্ছপ পাচারকারি দল। পরিকল্পনা চূড়ান্ত করল কিভাবে কচ্ছপ বিদেশে পাচার করা যায়। দেশীয় পাচারকারি দল তাদের সঙ্গে হাত মেলাল। দ্বিপাক্ষিক পরিকল্পনায় অবশেষে সফলভাবে কচ্ছপ পাচার শুরু হয়ে গেল। ব্যক্তিগত রঙমহলে আমোদে ব্যস্ত সুশীল কচ্ছপেরা কিচ্ছুটি টের পেলেন না। টেলিভিশনে স্ট্যান্ডআপ কমেডির রিয়েলিটি শো’তে চট্টগ্রামের এক কচ্ছপকে ট্রল করার জন্য জিজ্ঞেস করা হল--রাত গভীর হলে তোমাদের কী আসে? সে বলল, ‘গুম’ আসে। উপস্থাপক ছিল একটা পেঙ্গুইন। এই উত্তর শুনে তার সে কি হাসি! গড়াগড়ি খেতে খেতে বলল, গুম! গুম! মানে ঘুম আসে! ও আচ্ছা! তোমাদের তো আবার ‘অল্পপ্রাণ’।
খোলসের আবডালে আমাদের প্রত্যেকেরই ব্যক্তিগত রঙমহল গড়ে উঠল। আমোদে নাচি, গাই আর খাই। রাতের আঁধারে ডিম দিতে গিয়ে কয়টা কচ্ছপ নিঁখোঁজ হলো, করোনায় কয়টা মারা গেল, সেসব খবর আমাদের খোলস ভেদ করে না। মৃত্যুর শীতল সংবাদে খোলস থেকে মাথা বের করে নকল শোকবার্তা দিয়ে আবার মাথা ভিতরে ঢুকিয়ে রাখি। গুমোট আবহাওয়ায় বৃষ্টির প্রত্যাশা নিয়ে ঘুমুতে যাই। টের পাই আামাদের ঘুম কখনো কখনো ‘গুম’ হয়ে যায়।
শুনেছিলাম আমাদের মধ্যে যারা শামুক হয়েছিল--তারা খুব ভালো আছে। পায়ের আওয়াজ পেলেই তারা মুখে তালা মেরে চুপ করে বসে পড়ত। ব্যস, আর কোনো বিপদ নেই। কিন্তু আজ শুনলাম অন্য খবর। কোনো এক হাঁসের খামারি এসে বস্তা ভরে সব শামুক নিয়ে গেছে। মুখ খোলার ভয়ে একটা শামুকও রা করেনি। কাস্তে দিয়ে আস্তে আস্তে মুখ খুলেছে খামারি। অতঃপর হাঁসের পেটে। খবরটা শুনে আমার মোটেই খারাপ লাগেনি। আমাদের কারোরই লাগেনি। কারণ আমরা এখন কচ্ছপ।
লটারিভাগ্যে যারা কচ্ছপ কিংবা শামুক না হয়ে পেঙ্গুইন পাখি হয়েছে, তারা আছে বেশ শান্তিতে। পেট ভরা চর্বি। শীত স্পর্শ করতে পারে না। গরম লাগলে বরফের চাই ধরে ভাসতে থাকে। বরফ জলে স্নান করে গরম স্যুপের বাটিতে চুমুক দেয়। রাত এলে ভদকার বোতলে বন্দী পরী নাচে। ভারী শরীর নিয়ে পেঙ্গুইন উড়তে পারে না।
কয়েকদিন আগে আমার পাশের বাড়ির সদ্য শামুক হওয়া এক ভদ্রলোক দাঁতের ব্যথায় রাতে এক ফোঁটাও ঘুমাতে পারেননি। বউ তার অনেক চাপাচাপি করল দন্ত চিকিৎসকের কাছে যাওয়ার জন্য। কিন্তু ভদ্রলোক যেতে রাজি নন মুখ খোলার ভয়ে। জানতে চাওয়া হলো, মুখ খুললে কী হবে? ভদ্রলোকের সোজা সাপ্টা জবাব, চিকিৎসক যদি জেনে যান যে, তিনি মানুষ থেকে শামুক হয়েছেন সম্প্রতি। জাত শামুক নন। মান ইজ্জত কি আর থাকবে তখন! তার চেয়ে ‘গুমের’ অষুধ খেয়ে ‘গুম’ যাওন-ই ভালো।
কচ্ছপ জীবনের সবচেয়ে ভয়ঙ্ককর দিক হলো লোভের টোপ গিলতে গিয়ে বড়শি গিলে ফেলা। কখনো ছিপসহ পালাতে পারলেও ঠোঁট থেকে বড়শি আর খোলা হয় না। যন্ত্রণায় কাতরিয়ে হাঁসফাঁস করে মরে ভেসে উঠতে হয়। ইভ্যালি বড়শি গিলে হাঁসফাঁস করছে শত শত তরুণ কচ্ছপ। এর আগে ‘যুবক’ বড়শিতেও প্রাণ আটকে গেছে হাজার হাজার কচ্ছপের। ভাগ্য বদলাতে ‘ডেসটিনি’ বড়শি গিলেও শিক্ষা হয়নি আমাদের কচ্ছপ প্রজন্মের।
কচ্ছপ হওয়ার একটা বড় সুবিধা হলো খোলস। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ওজোন স্তর ছিদ্র টিদ্র হয়ে কী কী ক্ষতি যেন হয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর। রোদের তেজও নাকি বেড়েই চলছে। এসব খবর আমরা ফেসবুকে দেখি। পত্রিকায় পড়ি। কিন্তু রোদের উত্তাপ আমাদের স্পর্শ করে না। আমাদের উত্তপ্ত খোলসে পেঙ্গুইনরা ডিম সেদ্ধ করে খেয়ে যায়। আমরা জানি, কিন্তু টের পাই না মোটেও।
একবার তো আমাদের নিয়ে হা হা হি হি শুরু হয়ে গেল বিশ্বব্যাপী। বিদেশ থেকে একটা টিম এসেছিল মাথাপিছু আয় হিসাব করতে। বিপত্তিটা বাঁধল আমাদের নিয়ে। অপরিচিত লোক দেখে ভয়ে আমরা খোলসে মাথা ঢুকিয়ে সমুদ্রের তীরে রোদ পোহাতে গেলাম। এনজিও টিম কোনো মাথা খুঁজে পেল না। হতাশ হয়ে পেঙ্গুইনদের মাথা গুনেই ফলাফল দিয়ে দিল। পত্রিকায় মাথা পিছু আয়ের উচ্চ ফলনশীল খবর দেখে খুশিতে উচ্ছসিত হয়ে ফাঁকা চালের ড্রাম দিয়ে ডুগডুগি বাজাতে শুরু করলাম। ডুগডুগির তাল আরো বেশি পছন্দ হলো বিদেশি লোকদের। ফলাও করে প্রচার করা হলো আমাদের কচ্ছপনৃত্য। বিশ্বব্যাপী মানুষের মনের খোরাক যোগাতে পেরে নিজেদের কচ্ছপজনমকে সার্থক গণ্য করে তৃপ্তির ঢেকুর তুলতে শুরু করলাম। ঢেকুরে কোনো ঘ্রাণ ছিল না। পাকস্থলিতে কিছু ছিলই না।
কচ্ছপের আয়ু দুইশ বছর। আমরা সেই আয়ুর অন্তর্ভুক্ত কি না এখনো জানি না। কথিত আছে, রূপান্তরিত কচ্ছপরা এই আয়ু প্যাকেজ পাবে না। আশার বিষয় হলো, কে রূপান্তরিত আর কে প্রকৃত কচ্ছপ তা নির্ণয়ের উপযুক্ত কৌশল করো হাতে নেই।
আপনার মন্তব্য লিখুন