এক ঝটিকা সফরে গাইবান্ধায়


আমি একজন ভ্রমণপ্রিয় মানুষ!!

যদিও বিভিন্ন প্রতিবন্ধকতার কারণে ঘনঘন তা হয়ে উঠেনা। কিন্তু ঘুরাঘুরি আমার বরাবরই ভীষণ পছন্দের। গৎবাঁধা একঘেয়েমি জীবন- একদমই ভাল্লাগেনা।

তাই মন চাইলেই সাহেবকে নিয়ে হুটহাট বেরিয়ে পড়ি।

নিদেনপক্ষে 'সানু দা'র অটো রিক্সায় চেপে- (বটতলা টু ফুলতলা) বড় আপার বাসায় যাই। আমাদের বাসা থেকে বড় আপার বাসার দূরত্ব বড়জোর পনেরো/বিশ মিনিটের পথ। কিন্তু ওটুকু ঘুরে এলেই- মনে এক অনাবিল আনন্দ পাই!

এবার পূজার ছুটিতে 'জিহান' বাসায় এসেই বায়না ধরলো-

- চলো না মামনি, সবাই মিলে একদিনের জন্য কোথাও থেকে ঘুরে আসি!

জিহানের প্রস্তাবটা বেশ মনে ধরলো।

হ্যা, তাইতো যাওয়া যায়! যেই কথা সেই কাজ!

নাচুনে বুড়ির ঢাকে বারি পড়লে যা হয়।

"ধর মুরগি, কর জবো.."!!

লাফিয়ে বললাম--

-- চল, সবাই মিলে গাইবান্ধা এসকেএস ইন রিসোর্টে যাই। সেখানে এখন ধামাকা অফার চলছে! (Halloween) ব্যস!

খুবই শর্টটাইম ট্যুর।

মাত্র এক দিনের জন্য। জানের উপর যথেষ্ট ধকল যাবে, জানি। তা যাক। আমরা যাবই ইনশাআল্লাহ! সবাই একদম ডিটারমাইন্ড!

কপালে যা থাকে, থাক!!

প্রথমেই- গোয়েন্দা বিভাগে চাকরিরত (এন এস আই, উপ-পরিচালক, গাইবান্ধা) আমাদের প্রিয় ভাতিজা আলমগীর-কে ফোন দিয়ে বিস্তারিত জানলাম।

আলমগীর হোসাইন।

গনি ভাইয়ের সুযোগ্য বড়ছেলে। ভীষণ শান্ত স্বভাবের এবং ভদ্র-বিনয়ী। সবসময় হাসিহাসি মুখ নিয়ে ধীরস্থির ভাবে কথা বলে। স্পষ্ট গুছানো কথা।

মাশা-আল্লাহ! আলমগীর গল্পের আসরও জমাতে পারে বেশ ভাল!

একটু বলি-

আমার জানামতে- (আমাদের নেক্সট জেনারেশন) পরিবারের বড়ছেলেদের মধ্যে ভালো'র দিক থেকে স্পেশাল হলো- আব্দুল্লাহ, সোহেল, আলমগীর, রাজিব, মাশুক, শাহির। (হয়ত আরও অনেকে)। এরমধ্যে আব্দুল্লাহ আবার আরও স্পেশাল। পরিবারের প্রতি আব্দুল্লাহর অবদান- ত্যাগ-- বর্ণনা করার ভাষা আমার জানা নেই। সুদূর আমেরিকা থেকেও যেভাবে সুখেদুঃখে পরিবারের পাশে আছে সে- সুবহানআল্লাহ!! দোয়া নিরন্তর বাবা!

এরা একেকজন প্রতিটি পরিবারের জন্য আল্লাহ্‌ পাকের খাস 'রহমত' স্বরূপ।

মাশা-আল্লাহ! বড়দের তো এমনই হওয়া উচিত!

এদের সবথেকে বড় গুণ হলো-

★ এরা সবধরণের এবং সব বয়সের মানুষের সাথেই মিশতে পারে, সৎপরামর্শ দিতে পারে। কাজিনদের নিয়ে রাত ভোর করতে পারে রসালো গল্পগুজবের মধ্যদিয়ে।

★ পরিবারের সুখ-শান্তি বজায় রাখতে- এদের আছে যথেষ্ট সহনশীলতা, ত্যাগস্বীকারের এক বিশাল মানসিকতা। যাহোক।

এসকেএস ইন নিয়ে আলমগীরের রিভিউ খুব ভাল ছিল। ফলে যাবার আগ্রহ আরও দ্বিগুণ বাড়লো।

এরপর আমার কলিগ মাসুদ রানার কাছ থেকে ট্রেনের খবর নিলাম দফায় দফায়। রিসোর্টে বারকয়েক ফোন করে- দরদাম, সুযোগ- সুবিধা...ইত্যাদি শুনলাম। অর্থাৎ ঘন্টা খানের মধ্যেই সিদ্ধান্ত ফাইনাল করলাম যে-

হ্যা, আমরা যাচ্ছি এবং আগামীকালই ইনশাআল্লাহ।

প্রোগ্রাম সেট হলো-

বৃহস্পতিবার দশটার করতোয়া আন্তঃনগর ট্রেনে গিয়ে পরের দিনই ফেরা।

যাচ্ছি মোট নয়জন। আমরা পাঁচজন, বীথি, ছোট আপা (ডাঃ বীনা), এষা, রাফাত।

ট্রেন জার্নি!! বগুড়া টু গাইবান্ধা।

দারুণ এক্সাইটিং ট্যুর!!

এই ট্রেন জার্নি নিয়ে আমার জীবনের একটা মজার ঘটনা আছে। বলি-

মাত্র বছর পাঁচ/সাতেক আগের ঘটনা এটি। সাহেব তখন ঢাকা DHL এ চাকরি করতেন।

তো কথা হলো- আমি আর সাহেব (ছোট ননদ) বীথি'র শ্বশুরবাড়ি সাঘাটা'য় বেড়াতে যাবো- ট্রেনে চড়ে।

প্রথমবার যাচ্ছি!

দই-মিষ্টি সুন্দর করে কার্টুনে প্যাক করে সাথে নিয়েছি।

আমার আবার ট্রেনে উঠার অভিজ্ঞতা এক্কেবারেই নেই- জিরো। কিন্তু সাহেব নাকি খুব বেশি এক্সপার্ট। ভালকথা।

সেদিন প্রচণ্ড ভীড় ছিল। স্টেশনে লোকজন গিজগিজ করছে।

আমি প্রথমেই ভড়কে গেলাম। সাহেব অভয় দিয়ে বললেন-

-- আরে দূর, ভয়ের কিচ্ছু নেই মলি।

শোন, আমি আগে ট্রেনে উঠে সিট দখল করবো- তারপর তুমি ধীরেসুস্থে উঠবে।

তুমি শুধু দই- মিষ্টির প্যাকেটটা ভালভাবে শক্ত করে ধরে থাকবে- যেন হাত থেকে ছুটে না যায়।

মাথা নেড়ে সায় দিলাম- বেশ, তাই হবে।

এমন সময় হুইসেল...ঐ তো ট্রেন আসছে....!!!

ট্রেন এসে স্টেশনে দাঁড়ানো মাত্রই...ওরে আল্লাহ- সব মানুষ যেন একসাথে হুমড়ি খেয়ে পড়লো। সাহেব দেখি চোখের পলকে, নায়কের ভঙ্গীতে ভীড় ঠেলে নিমিষে ট্রেনে উঠে গেলেন। সবাই হুড়মুড় করে ধাক্কাধাক্কি, ঠ্যালাঠেলি-প্যালাপেলি করে ট্রেনে উঠছে। কিন্তু আমি উঠার কোনো চান্সই পাচ্ছি না। একসময় পড়লাম ভীড়ের মাঝেখানে। কোনো দিকেই আর বেড় হতে পারছি না-- না সামনে না পেছনে। মহাবিপদ!!

হঠাৎ মানুষের ব্যাপক চাপে, ঠেলাঠেলির মধ্যে দইয়ের প্যাকেট আটকা পড়লো এক পিচ্চির গলার সাথে। আর মহা মসিবতটা হলো তখনই!

পিচ্চির মাঝবয়সী জাঁদরেল মা ছেলের হাত ধরে সমানে সামনের দিকে টানছে...আর আমিও দই রক্ষা করতে শক্তহাতে তা ধরে আছি। দুজনই তখন নাছোড়বান্দা। দুদিক থেকে টানাটানি চলছে। তুমুল হাড্ডাহাড্ডি লড়াই!! টানাটানিতে কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছি না। পিচ্চির গলা ছিঁড়ে গেলেও সেদিকে খেয়াল নেই কারই।

একসময় পিচ্চির মায়ের কাছে আমিই হেরে গেলাম। দইয়ের প্যাকেটটা হাত থেকে ছিটকে পড়ে... ভট্টাস!

আমার জামাকাপড় মেখে একাকার হয়ে গ্যালো।

সাহেব জানালা দিয়ে সবকিছুই দেখলেন, হাসলেন, দুঃখপ্রকাশও করলেন কিন্তু ভীড় ঠেলে নিচে নামতে পারলেন না।

ট্রেন ছেড়ে দিল। আমি প্লাটফর্মে দাঁড়িয়ে অসহায়ের মতো শুধু চেয়ে থাকলাম।

সাহেব হাত নেড়ে আমাকে বিদায় জানালেন। আমি রাগে-লজ্জায়- কষ্টে বাসায় ফিরে এলাম- একা। শেষতক যাওয়া হয়নি।।

এবারের ট্রেন জার্নি কিন্তু চমৎকার ছিল!

এসকে এস ইন রিসোর্ট অপূর্ব সুন্দর, নান্দনিক ! সেখানকার হোটেল ব্যবস্থাপনা, পরিবেশ, খাবারদাবার আলহামদুলিল্লাহ্‌ সবকিছুই ভীষণ ভাল ছিল। ব্যাডমিন্টন, সুইমিং, বোটিং, সাইড সীন, বাউল গানের আসর, পুকুর ভরা মাছ, গাছপালা দিয়ে পরিকল্পিতভাবে সাজানো-গোছানো পুরো রিসোর্ট রাতের বেলা সত্যিই এক অভাবনীয় ভাললাগার আমেজ সৃষ্টি করেছে।

এককথায় অসাধারণ!!

প্রিয় মেজ আপাকে ভীষণ ভীষণ মনে পড়েছে- সবারই।

গাইবান্ধা স্টেশনে পৌঁছেই দেখি আলমগীর ওর সমস্ত ব্যস্ততা রেখে- গাড়ি এবং মটর সাইকেল নিয়ে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছে। গ্রেট!!

আলমগীরের আন্তরিকতা, সহযোগিতা, আতিথেয়তায় আমরা অতিশয় মুগ্ধ হলাম।

পরদিন দুপুরে সুমী'র (ভাসতা বউ) বহুপদের সুস্বাদু রান্না, আপ্যায়ন, গল্লগুজব...সবকিছু মিলিয়ে প্রচণ্ড রকমের ভাল সময় পার করলাম, আলহামদুলিল্লাহ্‌।

আলমগীরের দুই রাজপুত্র সামিত আর সাদাত যখন আস্তে আস্তে লজ্জা-জড়তা কাটিয়ে সবার সাথে গল্পে মেতে উঠলো- ঠিক তখনই আমাদের বগুড়া ফেরার বিদায় ঘন্টাও বেজে উঠলো..!!

আলমগীর ওর গাড়ি দিয়ে আমাদের সাঘাটায় বীথির বাড়ি অব্দি নামিয়ে দিল। সেখানে আগে থেকেই খাদেম ভাই দুইটা সিএনজি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন। রাত পৌনে ন'টার মধ্যেই আমরা সহি-সালামতে বগুড়া পৌঁছালাম- আলহামদুলিল্লাহ্‌।

হয়ে গ্যালো এক সাকসেসফুল ঝটিকা সফর!!

তাই বলছি-সাধ্য-সামর্থ্যের মধ্যেই-বেশি বেশি ভ্রমণ করুন!!

ভ্রমণ মানুষে-মানুষে হৃদ্যতা বাড়ায়, ভালবাসা ছড়ায়, দূরত্বকে কমায়, মনে প্রফুল্লতা আনে, মলিনতা ঝড়ায়।

আসুন না- আমরা আপনজন, পরিচিতদের নিয়ে হঠাৎ করে বেড়িয়ে পড়ি কাছেপিঠে কোথাও- একদিনের এক ঝটিকা সফরে!! সব দুঃখকষ্ট ভুলে কিছুক্ষণের জন্য হারিয়ে যাই সুখের আনন্দ সাগরে!!

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন