
দুধ, কলা, শিন্নি
- কী গো বিউটির মা, কই যাও? হাতে ওগুলা কী?
- আর কইয়ো না চাচী,দুদিন ধরে যা খারাপ খারাপ স্বপ্ন দেখি। খুব ভয় করে। তাই গেন্ডাপাড়ার ছলিম পীরের কাছে গেছিলাম, উনি কইলো গঙ্গীর মা বুঝি আমার কাছে দুধ,কলা চাইছে। তাই এক ছড়া কলা আর এক সের দুধ গাঙ্গে দিয়া আহি। যদি এই দুঃস্বপ্ন একটু কাটে।
- তই পীরেরে কিছু দেও নাই বিউটির মা? হুনছি ঐ পীরটা বেডা বেডি সবার সমস্যা দূর কইরা দেয়,বহুত কামেল পীর।
- হ্, চাচী এই কথা তো আমিও হুনছি। তাই তো গেছিলাম,আর পীর বাবারে পাঁচশ টাকা দিয়া আইছি।বাবায় তো নিতে চায় না,জোড় করে হাতে গুজে দিয়া আইছি।
- আচ্ছা,তাইলে যাও তুমি গাঙ্গে।
- আচ্ছা।
কালীগঙ্গার দুইপারে জোয়ারের উত্তাল স্রোত সজোরে বার বার আঘাত হানছে আর একটু একটু করে পাড় ভেঙ্গে নদীর জলে চিরতরে বিলীন হয়ে যাচ্ছে। ভয়ানক আকার ধারন করেছে যেন কাল সাপের উত্তেজিত ছোবল।
বিউটির মা আস্তে আস্তে নদীর ঘাটে নেমে নদীর জলকে বার কয়েক সেলাম করে দুধ আর কলা আস্তে করে দিলো ছেড়ে। দুধ নিমিষে মিশে গেল জলে আর কলা জল ভেদ করে নিচে পড়ে রইলো। বিউটির মা বললো, " আহ্, মা দুধ খুব দ্রুত গিলে ফেললো,মা আমার দান পছন্দ করছে। কলাগুলো হয়তো পরে খাইবো। যাক মা,তোমার যখন মনে চায় খাইয়ো"
এই বলে আবার বার কয়েক সেলাম করে পাড় বেয়ে ওঠে বাড়ির পথ নিলো।
ঐ দিকে নদীর পাড়ে এলাকার ডানপিটে ছেলে কালু রামছাগল নিয়ে এসেছে গোসল করাতে। ছাগলকে যতই রশি ধরে টানে ছাগল ততই পেছনে যায়,গলা ছিঁড়ে যাবে। তবুও নামবে না,পানি যেন ওর কাছে কুরবানীর ধারালো ছুড়ি। কালু দেখলো বিউটির মা দুধ কলা দিয়া গেল নদীতে। তখন হাঠাৎ করে তার মাথায় একটা বুদ্ধি খেলে ওঠলো। সে বললো, " ছাগলরে দেখি কলার খোসা খাইয়ে নামাতে পারি কিনা? ততক্ষণাৎ কালু ছাগলকে একটা গাছে বেধে রেখে ব্যাঙের মত লাফ দিয়ে পড়লো নদীর ঘাটে।অনেকক্ষণ খুঁজে পেল কলার ছড়া। কলার ছড়া খুঁজে পেয়ে তো কালু তো বিষম খুশি। ঐদিকে ছাগলও কলা দেখে ব্যা ব্যা করে ওঠলো। কালু বললো, " শালা এইবার তো নামবা গাঙ্গে।"
কালু নদীর পানিতে দাড়িয়ে এক একটা করে কলা খেতে লাগলো আর খোসাগুলো জমাতে লাগলো, কলা খাওয়া শেষে গাছ থেকে ছেড়ে ছাগলের দিকে খোসা দেখিয়ে বললো, " আয় এবার,আয়।"
ছাগলও কলার খোসা দেখে তরতর করে ঘাটে নেমে গেল। যেই জলের কাছে নামলো,অমনি ছাগলের পাছায় দিলো লাথি, ছাগল ব্যা করে নেমো পড়লো জলে। তারপর ছাগলকে কলার খোসা খেতে দিলো।ছাগলও কলার খোসা খেতে লাগলো।
পরদিন শুক্রবার, কালু গেলো মসজিদে নামাজ পড়তে। নামাজ পড়া শেষ হলে গ্রামের টেংকু মাতাব্বর পাঞ্জাবী বার দুই ঠিকঠাক করে বললো, "মিয়ারা, এইবার তো কালীগাঙ্গের পানি যেইহারে বাড়তাছে, মনে হয় গত বছরের মতো এইবারো ঘরবাড়ি কয়েকটা ভাঙ্গবো। তাই তোমাগো কইতাছি, তোমরা যদি সবাই কিছু কিছু টেকা পয়সা দাও, তাইলে দুইশো বাঁশ কিনে একটা বেড় দেওয়া যাইবো। পানির ধাক্কা কিছুটা হইলেও থামবো,না হলে তো দেখছোই কেমনে নদীর পাড় ভাঙ্গে।"
মসজিদের বাকী মুরব্বীরা তখন বললো, "হ্, মিয়া কথা তো ঠিকই কইছো, চলো কাল থেইক্কা টেকা উঠানো শুরু করি।"
কালু হেসে মনে মনে বলতে লাগলো, "হায়রে মাতাব্বর, গত বছরও বর্ষা শেষ হওয়ার পরেই গাঙ্গে ড্রেজার লাগাইছো, ইচ্ছামতো বালি বেঁচে টাকা কামাইছো। আর এখন বাঁশ দিয়ে ব্যাড় দিতে চাও। বাঁশ যদি তোমার... " - বলে স্মরণ করলো রহমানের দাদার কবর ভেঙ্গে পড়ার কথা, আহ্ মৃত লোকটাও শেষে কালীগঙ্গার হাত থেকে রেহায় পায়নি।
যেদিন কবরটা ভেঙ্গে যেতে লাগলো ঐদিন টুকু মুনশি বললো, "মিয়ারা তো শুক্রবার ছাড়া মসজিদে আহো না, আল্লাহ্ যদি বেজার হয় কি করবা! সবকিছুই তো আল্লাহ্র হাতে।" তখন গ্রামের মেট্রিক পাশ করা বাবুল বললো, "আল্লাহ্র হাতে সব কিছু, ঠিক আছে। কিন্তু আল্লাহ্ তো তোমাগো জ্ঞান বুদ্ধি দিছিলো, কোনটা করলে মঙ্গল হবে, কোনটা করলে অমঙ্গল হবে। তোমরা তখন তা চিন্তা না করে চেয়ারম্যানের বেড়িবাঁধের আশায় বসে বসে টেকার পেছনে ছুটছো। উপর দিয়া বেড়িবাঁধ, নিচ দিয়া তল ফুটা করছো।"
তখনই এক লাফে ত্যাড়া ওরফে তারা মিয়া বলে ওঠলো, "ঐ ছেমড়া এত বেশি কথা কছ ক্যা? দুইডা বই পইড়া আমাগো ধর্মের জ্ঞান দিবার আসোছ, তুই জানোস এইবার গঙ্গীর মা শিন্নী পায় নাই দেখে তার কালা কালা বিচ্ছু বাহিনী মাটি কাটবার জন্যে লাগায় দিছে। এই কারনেই তো পানির তল দিয়ে পাড়ের মাটি কাইটা নিয়া গেছে,তার জন্যেই তো কবরটা ভেঙ্গে গেল।"
এই কথা শুনে বাকী লোকজন বললো, "হ্ হ্ ত্যাড়া মিয়া ঠিকই কইছো, এই ছেমড়া মেট্রিক পাশ কইরা এখন ভাতেরে কয় অন্ন। যা যা স্কুলে গিয়া পোলাপানগো জ্ঞান দে গা।"
পূর্ব স্মৃতি মনে করে কালু নামাজ শেষে মসজিদ থেকে বের হয়ে গেল।
সপ্তাহখানেক পরে টেংকু মাতাব্বরের নেতৃত্বে এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তি প্রায় ১০ হাজার টাকা উঠিয়ে বাঁশ কিনে আনলো। এলাকার লোকজনই বাঁধ দেওয়ার কাজে ওঠে পরে লাগলো। দুদিনের মধ্যেই কালীগঙ্গার ঘাটে লম্বা করে বেড় দেওয়া হলো।বেড় দিয়ে তো সবাই খুশি। তখন ত্যাড়া মিয়া টেংকু মাতাব্বরকে বললো, "মিয়া ভাই,বেড়া তো দিলা, এখন যদি এক ডেকচি শিন্নী না রান্না করে গঙ্গীর মা রে দাও, তাহলে তো আবারও ভাঙ্গবো। মায়ের রাগের কাছে এই বাঁশের বেড়া কিছুই না।"
মাতাব্বর বললো, " হ্, ঠিকই কইছোত ত্যাড়া,কাল পরশু তাইলে শিন্নী রান্নার ব্যবস্থা কর,চাল ডাল আমিই দিমু নি।"
নদীর পাড়ে দুই ডেকচি শিন্নি রান্না করা হলো,এলাকার সব ছেলেমেয়ে শিন্নী খাওয়ার জন্যে আসলো,সাথে কালুও আসলো। এক ডেকচি শিন্নী প্রথমেই মাতাব্বর জন কয়েক লোক নিয়ে নদীর জলে ঢেলে দিলো,ত্যাড়া মিয়া বললো, " শিন্নী তো অনেক গরম,একটু পরে দিতা,গঙ্গীর মা যদি আবার রাগ করে"।মাতাব্বর বললো, " আরে না পাগল,পানিতে ঢালছি, ঠাণ্ডা হইয়া যাইবো। "বাকী অন্য ডেকচির শিন্নী ছেলেমেয়েদের মধ্যে বিলিয়ে দিলো,কালু শিন্নী খেতে খেতে বললো, "ত্যাড়ার বাচ্চা ট্যাড়া গঙ্গীর মা বুঝি গরম শিন্নী খাইতে পারবো না,গঙ্গীর মা দুইদিন পরে তোরে খাইবো।"
মধ্য আষাঢ়, ঘন ঘন বরষা, বৃষ্টি আর থামতে চায় না, টানা দিন চার নাগাদ বৃষ্টি। এদিকে নদীর জল ফুলে ফেঁপে ওঠেছে। কালীগঙ্গা এবার অনবরত ভেঙ্গে চলছে। মাঠ গিলছে, সবজি ক্ষেত গিলছে, গিলেছে দক্ষিণ পাড়ের বাঁশঝাড়। আর নদীর বাঁশের বেড়া, সেটা তো প্রথম ধাক্কাতেই ভেঙ্গে নিয়ে গেছে, কোথায় গেছে! কেউ জানে না।
টেংকু মাতাব্বর ত্যাড়াকে বলে, "ওরে ত্যাড়া রে, এইবার মনে হয় কেউ রেহায় পাইবো না, দেখ কেমন গর্জন করে ওঠে"। ত্যাড়া বলে, "হ্ মিয়া ভাই"।
বৃষ্টি আর নদীর জলে তাল মিলিয়ে উত্তাল স্রোতে ভেঙ্গে গেলো মাতাব্বরের ধানী জমি,ভেঙ্গে গেলো বিউটির মায়ের বাড়ি। বিউটির মা গগনবিদারী চিৎকার দিয়ে বলতে লাগলো, "আল্লা রে আমার কি হইলো রে,এখন আমি কই যামু রে!"
কালু কালীগঙ্গার দিকে স্তব্ধভাবে দাড়িয়ে থেকে গরুর গোবরের ন্যায় মুখ করে বললো, "হায় রে গেরাম, এরাম করে আর কতো বাড়ি ভাঙ্গবো! দোষ কার?"
আপনার মন্তব্য লিখুন