লেখক সাহেবের বিচার


লেখক সাহেব কাঠগড়ায়। তার আজ বিচারের শুনানি।

কাঠগড়াটি প্রচলিত বিচারালয়ের কাঠগড়া নয়। বাতিঘরের বাংলামোটর শাখার কফি জোনের পাশের পাথরের বেদীটা। এদের ইন্টেরিয়র ডেকোরেশনে আজ সামান্য পরিবর্তন এসেছে। ছাড়ে বিক্রির ম্যাগাজিনের স্তূপ রাখা হয় যেখানে, সেখানটাতে আজ কোনো ম্যাগাজিন নেই। সকাল সকাল সরিয়ে পেছনের অংশে নিয়ে যাওয়া হয়েছে অস্থায়ীভাবে।

লেখক সাহেব বসা প্রশস্ত সেই না-টেবিল-না-বেঞ্চ-না-চেয়ারসদৃশ অদ্ভুতদর্শন পাথুরে বেদীটার ওপর। তার ডানপাশে উরুঘেঁষে রেখে দেওয়া ওয়ান টাইম কাপটার গায়ে ইংরেজিতে নেসক্যাফে লেখা সাদা হরফে। কিছুক্ষণ আগেই একচুমুক খেয়ে চোখ-কপাল কুঁচকে বিরক্ত চেহারায় কাপটা ওখানে রেখেছেন লেখক সাহেব। ওদের চিনি কম দিতে বলেছিলেন তিনি। একেবারেই চিনি ছাড়া কফি খেয়ে বিস্বাদে গুলিয়ে আসে প্রায় লেখক সাহেবের গা। চোখ-কপাল কোঁচকানোতে তার চশমাটির পড়োপড়ো দশা হয়। বাঁহাতের তর্জনী চশমার সেন্টার-অব গ্র্যাভিটিতে রেখে তাতে একটা আলতো ঠ্যালা মেরে ঠিকমতো বসান চোখে।

এবার চোখটা একবার বন্ধ করে আবার খুলে সামনে তাকান তিনি।

বিচারের ভার পাঠকদের ওপর। সকলে আসেননি। যারা এসেছেন তারাই তটস্থ করে ফেলবেন প্রশ্নবাণে। লেখক সাহেব সেই পাথুরে বেদীতে দুহাতের ভর রেখে প্রমাদ গুনছেন।

এসি চলছে। পাথরটাও যথেষ্ট ঠান্ডা। তারপরও হাত ঘেমে ঘেমে যাচ্ছে তার। অযথাই জ্বরও বাধিয়ে ফেলেছেন হয়তো। বাঁহাতের ভর পাথরে রেখে কাঁপতে-থাকা ডানহাত কোনোমতে কপাল পর্যন্ত তুলে বুঝতে চেষ্টা করেন তাপমাত্রার গতিক। ঠিক বুঝে উঠতে পারেন না। তবে পেটের মধ্যে প্রজাপতির নাচন ঠিক বুঝতে পারেন।

ঝামেলাটা পাকিয়েছে তার লেখার দুটো চরিত্র—সুরমা আর রূপসা। প্রেমের কাহিনি লিখবার কথা থাকলে হয়তো এই দুজনের একজনকেই নায়িকা বানাতেন তিনি। মুশকিল হলো প্রেমের কাহিনি তিনি লেখেননি। লিখেছেন জীবন। আর এই সত্যটাই কাউকে বোঝানো যাচ্ছে না। মানতে প্রস্তুত নয় ক্ষুব্ধ নিখিল বঙ্গ পাঠক সমাজ। যতবারই বলছেন প্রেমের গল্প আমি লিখিনি, সমাজের একটা গ্রুপ পাল্টা প্রশ্ন ছুঁড়ছে—কেন লেখেননি? লেখকের ইচ্ছে অনিচ্ছের আবদার বা যুক্তি শুনতে এই গ্রুপ ইচ্ছুক ত নয়ই, প্রস্তুতও নয়।

কেন লেখক প্রেম লেখেননি, প্রেম কেন তিনি লেখেন না, তা তাদের শুধু আজ নয়, বহু আগে থেকেই ভাবায়। আজ সুযোগে সব গরল উগরে দিতে যতটা কাট-কাট কথা বলা প্রয়োজন, তাতে একবিন্দু ছাড় দেবে না তারা। অফিস, ব্যাংক, স্কুল, কলেজ থেকে ফিরে আসা বিভিন্ন বয়সের পাঠক। পাঠক বিভিন্ন পেশার। চর্মকার, কর্মকারেও পড়ে। পুঁথি পড়ে, পুঁথি শোনে। মনসামঙ্গল, কমলার পুঁথি, শিবের গাঁজন, গাজী কালুর পুঁথি। এরা অবশ্য লেখককে সজ্জন মেনে তাকে বাহবা দিতেই এসেছে। সংখ্যায় নেহায়েত কম।

ফেসবুক ইভেন্টে বলা ছিল—সকল পাঠক সবান্ধবে আমন্ত্রিত। আজ সে কারণে জাতপাতনির্বিশেষে সকল সম্ভাব্য পাঠক হাজির হয়েছে। মজার কথা হচ্ছে, তাতে কফি জোন থেকে শুরু হয়ে এত বড়ো জমায়েত হয়নি পাঠকের, যাতে রিসিপশন পর্যন্ত ভিড় হয়। বরং রিসিপশন থেকে বামদিকে এসেও দিব্যি দু'চক্কর হাঁটবার আর বই দেখবার জায়গা পাবে অন্যরা।

এই অল্পসংখ্যক পাঠকের মধ্যেও প্রবল জাত্যাভিমানপ্রসূত-ব্যবধান দেখে লেখক সাহেব যারপরনাই হতাশ—আমি মানুষের লেখক নই, দুদল গাধার লেখক! কাদের জন্য এত করে জীবন লিখি আমি?

অফিসকরুয়ারা এসে যখন অবসরে বই উল্টে দেখে—'মিডলক্লাস বয়ান' উপন্যাসে সব আছে, প্রেম নেই—বিরক্ত হয় তারা।

ছাত্রছাত্রীর দল যখন বার্ষিক পরীক্ষা শেষে অবসরে গল্পের বইয়ে মুখ গুঁজে দেখে—'পাঠশালা' কিশোর উপন্যাসে সব আছে, স্কুল-পালিয়ে প্রেম নেই—তারা হয় চূড়ান্ত মাত্রার হতাশ।

কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ছেলেমেয়েরা যখন 'ভিসি চত্বর' উপন্যাসে কেবল ছাত্ররাজনীতি আর খুনোখুনির কাহিনি পড়ে, পড়াশেষে তারা বিলো অ্যাভারেজ অথবা গার্বেজ বলে ঠোঁট উল্টে অন্য কাজে মন দেয়।

সবাই কেবল প্রেমই চেনে।

এদের, এই বিশ্বপ্রেমীদের প্রশ্নের খড়্গ-কৃপাণে লেখক সাহেবের আহত হবার কথা। তিনি পাবলিক-ডিম্যান্ড মেটাতে ব্যর্থ। কিন্তু তার হাবেভাবে সেরকম কোনো লক্ষণ প্রকাশ পায় না। তিনি বরং তার ঘেমে-যাওয়া হাতদুটো তুলে নিতম্বের ভর পাথরের বেদীর ওপর দিয়ে দুহাত এক করে একটা ছোটোখাটো হাই তোলেন। উপস্থিত নিখিল বঙ্গের আল্ট্রামডার্ন নারী উপআহ্বায়ক এবং তার ব্যক্তিগত সহকারি (নারী) উভয়েই এ ব্যাপারটায় দারুণভাবে বিরক্তবোধ করে উঠে চলে যান। যেতে যেতে রাগে-গজগজ কণ্ঠে বলে যান—মিস্টার হোপলেস কোথাকার! ম্যানার নেই কোনো! সে আবার লেখে! রাইটার, মাই ফুট!

তাকে যেতে দেখে কফি জোন থেকে দৌড়ে একটা ছেলে তাকে থামিয়ে বিল চাইতেই আচমকা এক থাপ্পড় মেরে বসেন উপআহ্বায়কের ব্যক্তিগত সহকারি। এমনিতেই আজ বড়ো দান মারবার একটা সুযোগ ছিল ইভেন্ট হোস্টিং বাবদ। লোক কম হওয়ায় ইভেন্ট জমেনি। এখন থাপ্পড় খেয়ে বঞ্চনার ষোলোকলা পূর্ণ কফিবয়ের। ছেলেটা আজই কাজে যোগ দিয়েছে। ডানগাল ডলতে ডলতে পাশে তাকিয়ে দেখে—মোটা ফ্রেমের মোটা কাচের চশমা পরা গোলগাল চেহারার এক এস্থেটিক আপু বাঙ্গিকাটা একটা হাসি দিয়ে লিফটের দিকে এগিয়ে গেল।

রূপসাকে নিম্ন আয়ের চরিত্র হিসেবে লিখেছেন লেখক সাহেব। প্রথম অবস্থায় রূপসা একেবারেই খাঁটি পার্শ্বচরিত্রের কেউ ছিল। কিন্তু তার কিছু আচরণগত ডিটেইলিংয়ে লেখক ধন্দে পড়ে যান—একে নিয়ে আবার ভাববার অবকাশ আছে। ভাবনায় গার্মেন্টস শ্রমিক থেকে শুরু করে অল্প আয়ের বেশ্যা এবং হাইক্লাস পণ্যস্ত্রী হয়ে লোয়ার ক্লাস ঘরের-বৌ পর্যন্ত রূপসার বিস্তৃতি।

অন্যদিকে সুরমা। তাকে প্রধান নায়িকা ধরে নিয়ে চরিত্র লিখতে মন দিয়েছিলেন লেখক সাহেব। ডিটেইল করতে গিয়ে ভজঘট লেগে গেছে। বেরিয়ে পড়েছে থলের বেড়াল—আফিয়া খাতুন, তার মায়ের অতীত, বর্তমান। ঘটনাক্রমে সুরমা আর রূপসার সাক্ষাতে নায়িকা ইমেজের অল্প একটু বারোটা বাজলো সুরমার। এই জায়গাটিতে এসে লেখক সাহেব সিদ্ধান্তহীন হয়ে পড়েছিলেন—নায়িকাকে ডার্টি ইমেজ দেওয়া হলে মানুষ কীভাবে নেবে তাকে। আবার ক্লিন ইমেজে রাখতে গেলে প্রেম লিখতে হবে তাকে।

একটা করলে পাঠক তাকে হেডশট করবে হেসেখেলে, অন্যটাতে হারিকিরির লক্ষণ। তিনি যাবেন কোথায়?

এরকম একটা অবস্থায় আজকের বিচারের আয়োজন। কদিন হয় নিজেই একটা পোল খুলে ইভেন্টের ব্যবস্থা করে পোস্ট করেছেন লেখক সাহেব। সাকুল্যে তাতে দশজনেরও সাড়া মেলেনি।

যার সাড়া পাবেন না বলে ধরে নিয়েছিলেন, তার লেখকসত্তার জননী সেই মহিয়সী এখন লেখক সাহেবের সামনে দাঁড়িয়ে শুধু। আর সকলে চলে গেছে।

লেখক সাহেবের নাকে পেঁয়াজ আর ডিমমাখার খুব পরিচিত অথচ বেনামি একটা ঘ্রাণ খেলে চলেছে বহুক্ষণ। তিনি দেখছেন সেই মহিয়সীর ঠোঁট নড়ছে। ইনিই ত লেখক সাহেবকে পড়তে শিখিয়েছিলেন! শিখিয়েছিলেন চোখের ব্যবহার!

লিপগ্লসে ভিজিয়েও ঠোঁটদুটোর গায়ে চার-চার আটটা কাটাদাগ ঢাকতে পারেননি মহিয়সী।

লেখক সাহেব বিচার মেনে নিয়েছেন।

মহিয়সী বলেছেন—বি ইওরসেলফ।

অযথা পোলকাণ্ড করার শাস্তি এক কাপ চা—চিনি ছাড়া।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন