
পিকআপ ফিস
মল্লিক বাড়ির চনমনে কিশোর মন্ময়ের মাথায় হুট করে একটা চিন্তার উদয় হলো। কোয়ারেন্টাইনে আয়-রোজগার করে সে কোটিপতি হবে এমন আভাস স্পষ্ট না হলেও সে যে এক দুরভিসন্ধির সাথে সন্ধি করছে তা স্পষ্ট হলো যখন মাছের ব্যবসা নিয়ে মাথা ঘামানো শুরু করলো সে। ক্ষুদ্র মস্তকে তিনপ্রস্থ চিন্তা বিছিয়ে সে আবিষ্কারের নেশায় মেতে উঠলো। যেভাবেই হোক সে মাছের বাজার গরম করেই ছাড়বে। মাছ কাদের কাছে বিক্রি করা হবে, কত লাভ হবে, তার একটা হিসেবনিকেশ সে মনে মনে সেরে নিলো। নিজেকে মিনি বিল গেটস ভেবে মৃদু হেসে রাতে ঘুমোতে গেলো সে।
ইদানিং মনের মধ্যে চিন্তার জাদুতে সে আলাদিন বনে যায়। আলাদিনের আশ্চর্য প্রদীপ হাতে পেয়েছে কিনা। স্কুল-কলেজ বন্ধ থাকায় শিক্ষার্থীরা যখন পাপজি আর ফ্রি ফায়ারের নেশায় বুঁদ, তখন মন্ময় পুরোদস্তুর মাছ বিশেষজ্ঞ হওয়ার পথে হাঁটা শুরু করেছে। বাড়ির পাশের এঁদো ডোবা থেকে গুটি কয়েক ঝায়া মাছ দিয়ে সে তার প্রকল্প শুরু করলো। তার বাজেট বলতে জমানো পাঁচ টাকা। মাকে জ্বালাতন করে সে যে দুটো টাকা বাগিয়ে নেবে এমন সাহস তার নেই। বাপের পকেট গলিয়ে দশ টাকা হাতানোর মতো হিম্মত তার আজো হয়নি। বলতে গেলে, এক প্রকার বিনা পুঁজির প্রকল্পে নেমেছে সে।
ডোবা থেকে মাছ তুলে বদনায় করে বাড়ি নিয়ে এলো মন্ময়। সবার অলক্ষ্যে এমন একটা দুঃসাহসিক কাজে যে সে অংশ নিয়েছে এ জন্য নিজেকে বাহাদুর ভাবা শুরু করলো। অন্য পাত্রে নিলে মা-বাবার প্রশ্নের সিঁড়ি পেরুতে তাকে হিমশিম খেতে হবে, তাই সে বদনাকে উপযুক্ত পাত্র ভেবে মাছগুলিকে সেখানে চালান করলো। মাঝেমাঝে দেখে নিলো যে মাছ পটল তুললো কিনা। গোটা পঞ্চাশেক ঝায়া মাছ সে সংগ্রহ করেছে বটে, কিন্তু সময় গড়াতে না গড়াতেই তাদের সংখ্যা জ্যামিতিক হারে কমতে লাগলো। বাকী থাকলো আর দশ।
ঝায়া মাছের গায়ে নীল রঙ মাখিয়ে বিদেশি মাছ বানানোর ফন্দি করলো সে। এ মাছ বিক্রির জন্য সে আগেভাগেই খদ্দের ধরেছে। খদ্দের তার পূর্ব পরিচিত, ক্লাসের বন্ধু অনিক আর পার্থ। ওরা তো বিদেশি মাছ কেনার জন্য অধীর আগ্রহে বসে আছে। দামে কম মানে ভালো, এমন মাছই ওরা খুঁজছিলো। একুরিয়াম রঙিন মাছে ভর্তি হবে জেনে ওদের রাতের ঘুম যেন পালিয়ে গেলো।
মন্ময় ঝায়া মাছের গায়ে যুতসইভাবে রঙ করলো, কয়েকটা মাছ পটল তুলতে দেরি করলো না বটে। সহসা কপালে তার চিন্তার রেখা অঙ্কিত হলো। বাকী থাকলো আর ছয়টি মাছ। রঙ করার পরে মাছগুলো দেখতে বেশ লাগছিলো। মনে মনে সে নিজেকে আজব কারিগর ভাবা শুরু করলো। এ জন্য অবশ্য তার গর্বের শেষ নেই।
সহসা হম্বিতম্বি করতে করতে জোরে সাইকেল হাঁকিয়ে চলে এলো দুই খদ্দের- অনিক আর পার্থ। দ্রুত সাইকেল থেকে নেমে তারা মন্ময়ের হাতে পলিথিনে মাছ দেখে খুব পুলকিত হলো। ওদের চোখে তখন আনন্দের বান। এতো খুশি কোনোদিন হয়নি ওরা। পলিথিনের মাঝে নীল রঙের মাছগুলি সোল্লাসে খেলছিলো। মন্ময় দ্রুত মাছগুলি চালান করতে পারলেই বাঁচে। অনিক বললো, ''এতো সুন্দর মাছ কই পেলিরে, মন্ময়?" পার্থ বললো, "তোর দাদু বিদেশি মাছের ব্যবসা করে নাকি? দেখ, কী জোস মাছগুলো!" নতুন একটা পঞ্চাশ টাকার নোট মন্ময়ের হাতে সঁপে দিয়ে ওরা দ্রুত সাইকেল হাঁকিয়ে চলে গেলো।
পঞ্চাশ টাকার নতুন নোটটি নিয়ে মন্ময় ভালো করে দেখে নিলো সেটা জাল কিনা। তারপর সূর্যের আলোয় ধরে নিশ্চিত হলো এটা খাসা নোট। আনন্দ যেন তার মনে ধরে না। আনন্দের বন্যায় ভাসতে ভাসতে সে ঘরের ভিতর ঢুকলো। নিজের জমানো টাকার সিন্ধুকে নোটটি সযতনে রেখে দিলো সে। বিকালে আবার মাছ ধরবে এমন চিন্তা মন্ময়ের মাথা থেকে উবে যায়নি। কিন্তু তার মাথায় ঘুণাক্ষরেও এলো না, তার রঙিন মাছ নিয়ে অনিক আর পার্থ কী করছে।
ওদিকে অনিক আর পার্থ মাছ নিয়ে ওদের জল্পনা কল্পনার রাজ্য গরম করে ফেললো। পলিথিনের পানি থেকে মাছকে বালতিতে নিয়ে ওরা নতুন পানিতে ভাসিয়ে দিলো। ভাসাতে না ভাসাতেই মাছের গা থেকে রঙের পলেস্তারা খসে গেলো। কিছুক্ষণের মাঝে তিনটি মাছ একটু লাফিয়ে ঘুমিয়ে গেলো। ওরা কাঁদতে লাগলো এবার। জোরে কাঁদলে মা-বাবার পিটানি থেকে রেহাই পাবে না, তাই ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে গোয়াল ঘরের আড়ালে বসে কাঁদতে লাগলো। কিছুক্ষণ পরে যখন বাকী দুটি ঝায়া মাছ মারা গেলো, তখন ওদের কষ্ট আরো বেড়ে গেলো। দুই বেচারা কিশোর যে পঞ্চাশ টাকা খুইয়েছে এবং এর জন্য যে ওদের বন্ধুত্বের পাশাপাশি অর্থের ব্যাংকে ফাটল ধরেছে তা তারা অনুধাবন করতে পারলো।
গোসল নেই, খাওয়া নেই, গায়ে কাদা মাখানো। চোখের নিচে ক্লান্তির ছাপ স্পষ্ট থেকে স্পষ্টতর হয়ে উঠেছে। অনিক আর পার্থ ভিতরে ভিতরে গর্জে উঠেছে। যেভাবেই হোক এই লসের হিসাব কড়ায়গণ্ডায় মিটিয়ে দিবে মন্ময়, তা না হলে ওর বাবার কাছে তারা অভিযোগ দাখিল করবে।
সাইকেলের পিছনে পার্থকে বসিয়ে কাটফাটা রোদ্দুরের মাঝে অনিক সাইকেল চালিয়ে মন্ময়দের বাড়ির মোড়ের কাছে থামলো। মন্ময় তখন মাছ ধরার জন্য ডোবায় নামার প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। সে মাছ বিক্রি করে নিশ্চিন্তে এভাবে সময় কাটাচ্ছে জেনে বেশি কষ্ট পেলো ওরা। ওরা সাইকেল থেকে নামতেই মন্ময়ের বাবা শুভ মল্লিক ওদেরকে বললো, "তোদের কী হয়েছে রে?" ওরা কাঁদো কাঁদো স্বরে বললো, "কাকু, ঐ যে আপনার ছেলে মন্ময় আমাদের ধোঁকা দিছে। ও, ভুয়া পিকআপ ফিস দিছে।" তারপর ওরা জোরে কেঁদে উঠলো।
ঘটনা সবিস্তারে জেনে শুভ মল্লিক তার ছেলেকে ডাকলেন। ততক্ষণে এ ঘটনা গ্রামময় রাষ্ট্র হয়ে গেছে। গাঁয়ের মাস্টার মশাই হিসেবে শুভ মল্লিকের নাম এলাকায় সুবিদিত। তিনি নিজের ছেলের ছোকরামির কারণে আজ খুব লজ্জিত। নিজেকে সামলাতে পারলেন না তিনি। ছেলেকে ডেকে ইচ্ছামতো শাসালেন। ততক্ষণে অনিক আর পার্থ তাদের কান্নার গতি বাড়িয়ে চলেছে। পাশের বেড়া থেকে কচার ডাল ভেঙে শুভ বাবু ছেলের পিঠে ভাজ করতে করতে বললেন, "ওদের কাছে কী মাছ বিক্রি করেছিস?" তিন কিশোরের সম্মিলিত কান্নার মাঝে একটা শব্দ তখন বের হয়ে আসলো, "পিকআপ ফিস।" ততক্ষণে আকাশের সূর্য সহাস্যে নারিকেল পাতার আড়ালে মুখ লুকিয়েছে।
আপনার মন্তব্য লিখুন