
কুলি
"আপা, কুলি লাগবো?"
না-সূচক মাথা নাড়িয়ে এই মহিলাটিও চলে গেলো।
আজ মাত্র বিশ টাকা আয় হয়েছে সাকিবের। কোন যাত্রীই তার দিকে ঘুরে তাকাচ্ছে না। কারণ, সে বেজায় ছোট। কুলি হবার মতো বয়স তার হয়নি। সাকিবের মনে রাগ হচ্ছে তার মায়ের উপর। কেন যে মা তাকে ঢাকা নিয়ে এসেছিলো!
সাকিবের জন্মের আগেই তার বাবা ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়েন। তার অপারেশনের জন্য মোটা অংকের অর্থের প্রয়োজন হলে সাকিবের মা রাহেলা তার পৈতৃকসুত্রে প্রাপ্ত জমি-জমা বিক্রি করে দেয়। কিন্তু সাকিবের বাবা অপারেশনের কয়েকদিন পর মারা যান। তারপর রাহেলার শ্বশুর তাকে আর বাড়িতে স্থান দেয় নি। রাহেলা বাবার বাড়ি চলে আসলেও সাকিবের জন্মের পর থেকে তার ভাইয়েরা তাকে ও সাকিবকে বোঝা মনে করতে থাকে। যেহেতু রাহেলা তার প্রাপ্ত জমি-জমা বিক্রি করে দিয়েছিলো, তাই তার ভাইয়েরা তাকে নিজেদের সাথে রাখতে চাচ্ছিলো না। তবু ছয় বছর সবার অবহেলা সয়ে তাদের কাছেই ছিলো সে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আর টিকতে না পেরে অগত্যা শিশুপুত্র সাকিবকে নিয়ে কাজের আশায় ঢাকায় পাড়ি জমায় সে।
আজ ক'দিন ধরে রাহেলার জ্বর। ঢাকায় এসে কয়েকটি বাড়িতে বুয়া হিসেবে কাজ শুরু করেছিলো সে। ভেবেছিলো হাতে কিছু টাকা জমা হলে আগামী বছর সাকিবকে একটা স্কুলে ভর্তি করে দেবে। বেশ কয়েকমাস খেটে কিছু টাকা জমাও করেছিলো সে। কিন্তু বিশ্বজুড়ে করোনা মহামারির কারণে তার কাজগুলো ছুটে যায়। ফলে জমানো টাকা ফুরাতে শুরু করে।
লকডাউন শেষে নিজে আর কোন কাজ খুঁজে না পেয়ে নিরুপায় রাহেলা তার শিশুপুত্র সাকিবকে কুলির কাজে লাগিয়ে দেয়। কিন্তু বড়ো কুলিদের সাথে পেরে উঠে না সাকিব। ছোট্ট হাতে ভারি ব্যাগ উঠানোর ক্ষমতা তার না থাকলেও যে যাত্রীরা তাকে ভারি বোঝা চাপিয়ে দেয় তাদেরকে সাকিবের খুব আপন মনে হয়। তার মনে হয়, তার মতো ছোট্ট ছেলের শক্তি পরিমাপ করতে না পারলেও অন্তত তার প্রয়োজনটা একটু পরিমাপ করতে পারে তারা। কোনদিন সে মাত্র পঞ্চাশ-ষাট টাকা পায়, আবার কোনদিন তাও পায়না। যেখানে চাল-ডাল জোটানোই কঠিন, সেখানে সাকিব কোথায় পাবে তার মায়ের জ্বরের ঔষধ!
আজ সে ভেবেছিলো, যে করেই হোক মায়ের জন্য ঔষধ নিয়েই বাড়ি ফিরবে। কিন্তু রাত হয়ে এলো, অথচ তার হাতে মাত্র বিশ টাকা। সারাদিন পেটে কিছু পড়ে নি। ওদিকে মা ঘরে খালি পেটে জ্বরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। আর ভাবতে পারে না সাকিব। পরাজিত হওয়ার জন্যই যেন তার দুনিয়াতে জন্ম হয়েছে।
দেখতে দেখতে আকাশ জুড়ে গাঢ় অন্ধকার নেমে এলে এলোমেলো পায়ে বাড়ির দিকে হাঁটা ধরে সে। আজ কিছু কেনার ক্ষমতা বা ইচ্ছা কোনটাই নেই তার।
আপনার মন্তব্য লিখুন