
টাকার বাক্স
আমরা চার ভাইবোন বাবা মা দুজনেরই খুব আদরের। আমার বাবা গ্রামের আর দশজন মানুষের মতন খুব সাধারণ একজন মানুষ। বেশি শিক্ষিত নন। সামান্য লেখা পড়া জানা মানুষ। দাদার অনেক জমি ক্ষেত ছিলো চাষাবাদ হতো। দাদা মারা যাবার পর বাবাই সব দেখাশোনা করতেন। কারণ আমার বাবা ছিলেন দাদার একমাত্র সন্তান। আমাদের সংসার স্বচ্ছলই ছিলো। তেমন অভাব অভিযোগ আমাদের সংসারে কখনও দেখিনি। আমার মা ছিলেন শহরের মেয়ে। মা খুব করে চাইতেন আমরা স্কুলে যাই পড়াশোনা করি। আমাদের পাড়ার মেয়েরা তখন কেউ স্কুলে যেত না। কিন্তু আমার মা অনেক যুদ্ধ করেই আমাদেরকে স্কুলে পড়িয়েছেন। কিন্তু বাবার বেশি ইচ্ছে ছিলো না। ভাই দুইটা দশম শ্রেণী পর্যন্ত পড়েছে তারপর মায়ের চেষ্টায় ব্যবসা শুরু করছে। কারণ মায়ের চাষাবাদের কাজ পছন্দ ছিলো না।
আমাদের দুইবোন দশম শ্রেণীতে ওঠার পর বিয়ে দেন। মায়ের প্রচেষ্টায় আমাদের দুই বোনেরই সরকারি চাকুরিজীবী ছেলের সাথে বিয়ে হয়। ভাইদেরও বিয়ে হয়ে যায়। আমরা সবাই যার যার মতন সংসারী হয়ে উঠেছি। হঠাৎ একদিন দেখলাম বাবা খুব সুন্দর একটা কাঠের বাক্স তৈরি করে নিয়ে আসলেন। এবং তার সাথে বিশাল বড় একটা তালা ঝোলানো। আমরা সবাই অবাক! বাবা বাক্সে কী রাখবেন? এবং চাবি সব সময় বাবার কোমরে ঝুলিয়ে রাখতেন। এমন কী আমার মাকেও বাক্সের কাছে যেতে দিতেন না। এবং গভীর রাতে বাক্স খুলতেন। পাড়ার সব লোকজন বলতো বাবা নাকি টাকা জমিয়ে বাক্সে রাখে। বাবা হিসেবি মানুষ ছিলেন। কিন্তু কিপটা ছিলেন না। সব সময় বাবার সামর্থ্য অনুযায়ী আমাদের ভালো খাবার খাওয়াতেন, ভালো পোশাক পড়াতেন। এবং সব সময় দেখতাম বাবা মসজিদ মাদ্রাসায় গ্রামের সভা ওয়াজ মাহফিল সব জায়গায় টাকা দিতেন। গরীব অসহায় মানুষকে এবং কেউ বিপদে পড়লেও টাকা দিতেন।
কিন্তু এই বাক্সটা কেনার পর থেকে আত্মীয় স্বজন পাড়া প্রতিবেশি সবাই বলতে শুরু করলেন; তোদের বাবা দুনিয়ার কিপটা, শুধু টাকা জমায় কাউকে কিচ্ছু দেয়না। কিন্তু আমরা ভাইবোন কেউই বিশ্বাস করতে পারিনা। কারণ বাবার যতদিন শক্তি সামর্থ্য ছিলো ততদিন সংসারের সব ব্যয়ভার বাবাই বহন করতেন। কোন ছেলের কাছ থেকে কিচ্ছু নিতেন না। আস্তে আস্তে বাবা বয়সের ভারে নুইয়ে পড়লেন। বাবা সংসারের হাল ছেড়ে দিলেন। ভাইদের হাতে সব দায় দায়িত্ব দিয়ে বাবা অনেক খুশি এখন শুধু আল্লাহ আল্লাহ করেন। আর এদিক সেদিক ঘুরে বেড়ান। মসজিদে গিয়ে নাম নামাজ পড়েন। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে বেড়াতে যান। হঠাৎ একদিন বাবা আমাদের দুইবোন কে চিঠি দিয়ে আসতে বললেন। আমাদের সব ভাইবোনকে সামনে নিয়ে বাবা বললেন আমি অল্প কিছু জমি মসজিদে দান করতে চাই। তোমাদের মতামত জানাও। ওমনি আমার ভাই দুইটা না করে দিলো। ভাইয়েরা বাবাকে বললেন আপনি কিছু টাকা মসজিদে দিয়ে দেন। জমি দেয়া যাবে না। আমরা দুই বোন চুপ হয়ে গেলাম। বাবা খুব মন খারাপ করে উঠে আসলেন।
হঠাৎ মা অসুস্থ হয়ে পড়লেন। অনেক টাকা লাগবে। জানিনা কী মন করে আমরা চার ভাইবোন বাবাকে বললাম টাকা বাক্স ভর্তি করে রেখে কী হবে? যদি কাজে না লাগান। বাবা হেসে দিয়ে বললেন দশ পয়সা পাঁচ পয়সা দিয়ে কী আর তোদের মায়ের চিকিৎসা হবে? তোরা যদি টাকা না দিতে চাস আমি জমি বিক্রি করে তোদের মায়ের চিকিৎসা করাবো। এই কথা শোনার পর ভাইয়েরা গজগজ করে বললো ঠিক আছে আমাদের টাকা দিয়েই মায়ের চিকিৎসা হবে। আর আপনি বাক্স ভর্তি টাকা নিয়ে কবরে যাবেন। সেদিন আমরা দুই বোনও খুব অভিমান করলাম বাবার উপর। মায়ের চিকিৎসা হলো কিন্তু মাকে বাঁচানো গেল না। মা চলে গেলেন চিরতরে। মা চলে যাবার পর বাবা খুব চুপচাপ নিঃসঙ্গ হয়ে গেলেন। সারাক্ষণ খুব অসহায় বোধ করতেন। আমরা যে চার ভাইবোন বাবার উপর খুব রাগ করেছি, বাবা বুঝতে পারলেন কিন্তু কিচ্ছু বললেন না। মা মারা যাবার পর আমরা দুইবোন চলে আসলাম যার যার সংসারে। ব্যস্ত হয়ে গেলাম নিজেদের নিয়ে। মাঝে মাঝে বাবাকে চিঠি লিখি। বাবাও খুব অল্প কথায় উত্তর দেয় কাঁপা কাঁপা হাতে চিঠি লিখে।
হঠাৎ একদিন খবর আসলো বাবার অবস্থা খুব খারাপ। আমরা দুইবোন পৌঁছানোর আগেই বাবা চলে গেলেন অনন্ত পরাপরে।বাবার দাফন শেষ হলো। সকলের দৃষ্টি ও মনোযোগ তখন টাকার বাক্সের দিকে। আমরা সবাই এক নিমিষে বাবাকে হারানোর কথা ভুলে গেলাম। সকলের দৃষ্টি তখন বাক্সের দিকে।
বাক্স খোলার আগে টাকা কীভাবে ভাগাভাগি হবে এই নিয়ে সে কী তর্ক বিতর্ক। কে কতো টাকা বাবা মায়ের জন্য খরচ করেছি সব হিসেব শুরু হয়ে গেল। এমন বাকবিতন্ডা চলা অবস্থায় আমরা চার ভাইবোন টাকার বাক্স খুললাম। এবং একসাথে সবাই নির্বাক এ কী! এটা কী করে সম্ভব! বাবা বাক্স ভর্তি এসব কী রেখে গিয়েছেন? বাবা এতো দিন ধরে এসবই করেছেন। আমরা চারভাইবোন খুব ক্ষুদ্ধ হলাম। একে অন্যের দিকে তাঁকিয়ে থাকলাম। ভাবতে থাকলাম এটা কী হলো? এক মুহূর্তে আমাদের এতদিনের ভাবনা গুলো হাওয়া হয়ে গেল। টাকা কোথায়? বাক্স ভর্তি দেখছি শুধু ছোট ছোট কাগজের টুকরো কৈ এক টাকাও তো নেই। ছোট ছোট সব কাগজের টুকরো আসলে টাকা নয়; টাকা জমা দেয়ার রশিদ। বাবা তার সামর্থ্য অনুযায়ী দশটাকা পাঁচটাকা বিভীন্ন মসজিদ, মাদ্রাসা, এতিমখানা, গোরস্তান সব জায়গায়, যে সব টাকা দান করেছেন; সব কাগজের রশিদ গুলো রেখে দিয়েছেন। বাক্স ঘাটাঘাটি করতে করতে একখানা ভাজ করা বড় কাগজ দেখতে পেলাম। আমরা সবাই কাড়াকাড়ি শুরু করলাম। কী লেখা আছে সেটা দেখার জন্য। আমার বড়ভাই কাগজখানা হাতে নিয়ে পড়তে শুরু করলেন। বাবা তাঁর কাঁপা কাঁপা হাতে লিখে রেখেছেন।
"আমি জানি বাক্স খুলে তোমরা খুব আশাহত হবে চমকে উঠবে। আমার উপর তোমাদের প্রচন্ড রাগ হবে। আমি একটু একটু করে যেদিন থেকে দেখলাম তোমরা বড় হতে হতে পরিবর্তন হয়ে যাচ্ছো। সব কিছু নিজের করে ভাবতে ভাবতে স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছ। আমার নিজের সম্পদ যেটা, সেই জায়গা থেকেও সামান্য এক টুকরা জমি তোমরা মসজিদে দিতে চাইছো না। আমার মতন করে মাহফিলের জন্য একটা বাশ দিতে তোমরা কার্পণ্য করছো। আমি বুঝতে পারলাম। আমি বেঁচে থাকতেই তোমরা আমার জন্য একটাকাও খরচ করতে চাইছো না। আমি মরে গেলে তোমরা কী করবে সেটা বুঝতে বাকি রইলো না। তাই জমানো টাকা গুলো সব মসজিদ মাদ্রাসা এতিম খানায় দিয়ে গেলাম। বাদ বাকি সব সম্পদ তো তোমাদের জন্যই রেখে গেলাম। আশা করি তোমাদের সমস্যা হবে না। রশিদ গুলো রেখে গেলাম নইলে খালি বাক্স দেখে; তোমরা আমাকে মিথ্যাবাদী লোভী ভাববে? তোমরা ধারনা করবে টাকার লোভ দেখিয়ে আমি তোমাদের কাছ থেকে বেশি যত্ন নিতে চাইছিলাম। আবার অন্যদিকে তোমরা হন্যে হয়ে খুঁজে বেড়াবে তাহলে বাবার জমানো টাকা কোথায় রেখে গিয়েছেন? তাই আমি টাকার রশিদ গুলো রেখে গেলাম।
আমি তোমাদের যত্ন পাওয়ার জন্য নয়, তোমাদের মধ্যে মানবতা বোধের জন্ম দেবার জন্য এই কাজটা করেছিলাম। জীবনটা শুধু ভোগ বিলাসের জন্য নয়। জাগতিক সুখের জন্য নয়। একান্ত নিজের জন্য নয়। ভালো কাজের জন্য, সবাইকে নিয়ে ভালো থাকার জন্য। আজ থেকে এই বাক্সখানার মূল্য শেষ।
চিঠি পড়া শেষ হলো আমরা চার ভাইবোন চিৎকার করে কাঁদতে লাগলাম।
আপনার মন্তব্য লিখুন