গপ্পোকার


আর দশটা মানুষের মত প্রায়ই আমার মন বেশ গাঢ় বিষাদে ভরপুর থাকে। কোনো কাজে তখন মন বসাতে পারি না। একাকীত্বকে তখন বড় ভালোবাসতে ইচ্ছে হয়। তাই নিজের বিছানার বালিশের ঠিক মধ্যিখানে মাথা রেখে কিংবা ছাদের সেই প্রিয় সিঁড়ির ধাপে বসে পড়ে আমি একাকীত্বকে ভালোবাসতে শুরু করি।
একটা সময়ে এই বিষণ্ণতার ব্যাপারটা জড়িয়ে রাখতাম অদ্ভুত ছেলেমানুষির চাদরে। খুব করে মন থেকে চাইতাম, কেউ এসে আমার বিষণ্ণতাকে বুঝতে শুরু করুক, কেউ আমার অভিমান ভেঙে দিক, কিংবা কেউ দু-কলি গান অন্তত আমাকে শুনিয়ে দিক। স্বাভাবিকভাবেই কাউকে এগিয়ে আসতে দেখতাম না। কিন্তু আমার কাঁচা মন তো এসব বুঝবার মত অবস্থায় ছিল না। সে তখন ঝাঁপিয়ে পড়ত দুঃখবিলাসের সেই নদীতে, আর ধীরে ধীরে তাতে ডুবে যেত।
বিষাদের ভারে আমি অবশ্য কখনও কেঁদে ফেলিনি, তবে ঝিম মেরে বসে থেকেছি। আমার দু'টি শখ- বই পড়া ও লেখালেখিতে তখন ছেদ নেমেছে। বিষণ্ণতাকে অজুহাত হিসেবে দাঁড় করিয়ে লেখকসুলভ কৃত্রিম ভাবগাম্ভীর্য এনে আমি তখন বলে বেড়াতাম, "আর বলবেন না ভাই, রিডার্স আর রাইটার্স ব্লক, দু'টোতেই আছি।"
এভাবেই একদিন কথাচ্ছলে যাইদ ভাইকেও একথাটি বলে ফেলেছিলাম, এবং বলেই বুঝলাম যে মস্ত ভুল করে ফেলেছি। এখন যাইদ ভাইয়ের প্রশ্নবাণে জর্জর হওয়া লাগবে। যাইদ ভাই নিজের বিছানায় পা তুলে একটি বইয়ে ডুবে ছিলেন। আমার কথাটি তাঁর কানে যেতেই তিনি চশমার ফাঁক দিয়ে আমার দিকে যেন সন্দিগ্ন দৃষ্টি ফেললেন।
অল্প কিছুদিন হলো, যাইদ ভাই চশমা পরা ধরেছেন। খুব সম্ভব এটি প্লাস পাওয়ারের চশমা। কারণ শুধু বই পড়া, কাগজে কিছু লেখা কিংবা নিজের ল্যাপটপে কাজ করার সময় বাদে তাকে চশমা পরতে তেমন দেখা যায় না। আমার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে ছিলেন তিনি। এরপর দৃষ্টি ফেরালেন নিজের হাতে থাকা বইটিতে। আমি হাঁফ ছাড়লাম। যাক, জেরা হতে হয়নি।
.
যাইদ ভাই ইতালিয়ান লেখক Mario Pujo'র কালজয়ী উপন্যাস 'The Godfather' বইটি পড়ছিলেন। একেবারে মূল ইংরেজিটি। আমার মনে পড়ল, তিনি বইটি এর আগেও একবার পড়েছেন। সেটাও অবশ্য বহুদিন আগের কথা। হতে পারে প্রথমবার পড়াকালীন যে বিষয়গুলো চোখের আড়াল হয়েছিল, সেগুলোকেই তিনি এবার চোখের মাঝে ধরা দিতে চাইছেন। তাঁর মত করে আমি ইংরেজি ভাষার কোনো বই পড়তে পারি না। এটাই আমার একমাত্র আফসোস।
যেহেতু আমি রিডার্স ব্লকে (!?) আছি, তাই হাতের সামনে রাখা এস. এম জাকির হুসাইনের 'অন্ধকারের বস্ত্রহরণ' বইটি আমি পড়তে পারছি না। এমন নয় যে বইটি আমি খুলে দেখিনি। একজন অক্ষরজ্ঞানসম্পন্ন ব্যক্তি হাতের কাছে পড়ার উপযুক্ত এক টুকরো বাজে কাগজ পেলে তাতেও দু'চোখ বুলিয়ে নেয়। আর আমি তো একজন ক্ষুদে বইপোকা। তবে সেদিন এই 'অন্ধকারের বস্ত্রহরণ' নামক যুক্তিধর্মী বই পড়ার মত উপযুক্ত মানসিকতা একেবারেই ছিল না।
"তানসীর, তুমি কি কারো অপেক্ষায় আছ?"
প্রশ্নটি আমাকে বেশ বিব্রত করলো। কারণ এর জবাব দিতে আমি কিছুটা লজ্জা পাচ্ছিলাম। তার আগে ঘটনাটা জানিয়ে রাখি।
এক প্রাইভেট স্কুলে চাকুরি করতাম। সে সুবাদে এক শিক্ষকের সাথে সখ্য গড়ে তুলেছিলাম। তিনি অবশ্য বেশিদিন তাঁর চাকুরিতে ছিলেন না, তবে আমাদের নিয়মিত যোগাযোগটুকু অক্ষুণ্ণই ছিল। তিনি কথা দিয়ে রেখেছিলেন, একদিন আমার সাথে তিনি বেশ কয়েকটা জায়গা ঘুরে আসবেন। দিনটাও নির্ধারিত ছিল।
এমনকি সেদিন অপেক্ষার প্রহর কাটানোর উদ্দেশ্য নিয়ে যখন যাইদ ভাইয়ের বাসার উদ্দেশ্যে রওনা হলাম, তখনও সেই সাবেক সহকর্মী ঘুরে বেড়ানোর প্রতিশ্রুতিটি নিশ্চিত করেই রেখেছিলেন। অথচ যাইদ ভাইয়ের বাসায় আসার কিছুক্ষণ বাদেই তিনি ফোনে জানালেন, তিনি নাকি বেশ ব্যস্ত হয়ে পড়েছেন, তাই আর বেরোতে পারছেন না। কোনো প্রকারের দুঃখ প্রকাশ ছাড়াই তিনি ফোন কেটে দিলেন।
মানুষের ব্যস্ততার তড়িৎ উপস্থিতির বিষয়টি আমাকে ভাবিয়ে তুলল তখন। অথচ আমি যে বেশ দূর থেকেই এসেছি, তা যেন তিনি আর বিবেচনায় আনার প্রয়োজনই মনে করলেন না। হতে পারে, আমি তাকে যতটা গুরুত্ব দিয়েছিলাম, তিনি আমাকে ততটা গুরুত্ব দেননি - এই কথাটি মনে হতেই এক অদ্ভুত চাপা বিষণ্ণতার আবেশে আমার মনমেজাজ বেশ ঝিমিয়ে পড়েছিল।
আমি যাইদ ভাইয়ের সেই প্রশ্নের জবাব দিলাম,
"যাইদ ভাই, অপেক্ষায় তো ছিলামই। আপনার বাসা থেকেই এক জায়গায় যাওয়ার কথা ছিল। তবে যার অপেক্ষায় ছিলাম, এবং যেটির অপেক্ষায় ছিলাম, দু'টোই আমার অপেক্ষায় পানি ঢেলে দিল।"
"আচ্ছা, এই কথা। সে কারণেই এত সেজেগুজে আসলে তুমি।"
হ্যাঁ, বেশ সেজেগুজেই গিয়েছিলাম। বেড়াতে যাব বলে সেদিনের জন্যেই নির্দিষ্ট করে কমলা রঙের একটি টি-শার্ট ও একটি জিন্স প্যান্ট কিনেছিলাম। সাথে চোখে ছিল প্রিয় রোদচশমা।
"তো তানসীর, এখন কী করবে? তোমার প্ল্যান তো ক্যানসেল। তুমি কি বাসায় চলে যাবে?"
যাইদ ভাইয়ের কথার শেষ অংশটুকু পরিহাসের মত শোনাল কেন যেন। অথচ তিনি পরিহাস করবেন, এমন মানুষ নন। তবে হয়ত মনমেজাজ বেশ বিষণ্ণ ছিল বলেই সোজা কথাকে বাঁকা হিসেবে মনে হচ্ছিল। সত্যি কথা বলতে, তখন বাসায় ফিরে যেতেও ইচ্ছে হচ্ছিল না। আবার কোথাও যে একাকী হেঁটে আসবো, তাতেও মন সায় দিচ্ছিল না।
আয়নায় তো সে মুহূর্তে নিজের মুখটা দেখিনি। খুব সম্ভব সেই বিষণ্ণতার স্পষ্ট ছাপ আমার চোখেমুখে বেশ ভালোভাবেই ছড়িয়ে পড়েছিল। সেটাই যাইদ ভাইয়ের নজরে পড়ল।
"তোমাকে বেশ ক্লান্ত দেখাচ্ছে। তুমি এক কাজ করো, বিছানায় শুয়ে পড়ো। ভাতঘুম দিতে চাইলে দিতে পার। এখন দুপুর আড়াইটা বাজে। বসে থেকে আর কী হবে? এ সময়টা না হয় ঘুমিয়েই কাজে লাগাও।"
মন যখন ভীষণভাবে বিষিয়ে ওঠে, তখন শরীরটা নিজ থেকেই কোথাও গড়িয়ে নিতে চায়। আমারও এতক্ষণ ইচ্ছে হচ্ছিল বিছানায় শুয়ে পড়তে। তবে যাইদ ভাইয়ের অনুমতি না পেলে হয়ত সে ইচ্ছেবোধটুকু আমার সঙ্কোচবোধকে পেরোতে সক্ষম হত না। তাছাড়া আমার শরীর জড়িয়ে আছে বেড়াতে যাওয়ার নতুন পোশাক। এ ধরনের পোশাক পরে ঘুমোনোর অভ্যেসও নেই। তবুও মন খারাপের ঠেলাতেই শুয়ে পড়লাম। বালিশে মাথা রাখামাত্রই আমার সত্যি সত্যি মনে হলো, আমি আসলেই বেশ ক্লান্ত, এবং সেই ক্লান্তি এসেছে মানুষের এহেন দায়িত্বহীন আচরণে। আমার কেন যেন মনে হলো, আমাকে নিয়ে সেই সাবেক সহকর্মী একটা নিষ্ঠুর রসিকতাই করেছেন। কেন এমন করলেন তিনি, কে জানে?
.
ঘুম গভীর হলে নাকি মানুষ স্বপ্ন দেখে না। খুব সম্ভবত সেই দুপুরেও আমার ঘুমটা বেশ গভীর হয়েছিল। ঘুমের রাজ্যে ঘুরে বেড়িয়ে আমি কিছু খুঁজে পেয়েছি কি না জানি না, তবে হয়ত আমার মনের সমস্ত গ্লানির বোঝা আমি সেই ঘুমের রাজ্যের একেবারে গহীনে ফেলে দিয়ে আসতে পেরেছিলাম। কারণ ঘুম থেকে জাগতেই আমি শারীরিক ও মানসিকভাবে বেশ ঝরঝরে ও হালকাবোধ করছিলাম। আমার শরীরের সন্ধিগুলোতে অবশ্য একরকম স্বাভাবিক নিদ্রাজনিত জড়তা এসে জমেছিল।
বিরাট হাই তুলে আড়মোড়া ভাঙতেই সন্ধিগুলো সশব্দে জড়তা ভাঙতে শুরু করলো। উঠে বসলাম, ডানদিকে তাকালাম। দেখলাম যাইদ ভাইকে। তিনি তখনও একই জায়গাতেই, একই বই নিয়েই, চশমাচোখে সেই একই চেয়ারে হেলান দেয়ার ভঙ্গিতেই বসে রয়েছেন। তবে একই পৃষ্ঠায় হয়ত ছিলেন না, খুব সম্ভবত বইয়ের শেষ দিকেই ছিলেন।
আমি বিছানা থেকে পা নামিয়ে রাখলাম। সময় জানতে ঘড়ির দিকে তাকালাম। বিকেল সোয়া চারটা বেজে গিয়েছিল। দীর্ঘসময় ধরে আমি ঘুমিয়েই ছিলাম ভেবে বেশ লজ্জা পেলাম মনে মনে। বাহিরে তখনও বেশ চড়চড়িয়ে রোদ খেলা করছিল।
.
"ঘুম হয়েছে তোমার?" যাইদ ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে মাথা নাড়িয়ে ইতিবাচক জবাব দিলাম।
"আমার জানা ছিল না যে তুমি ঘুমের মাঝে নাক ডাকো।"
যাইদ ভাইয়ের কথাটি শুনে সামান্য অবাক হলাম আর লজ্জাও পেলাম। কারণ, স্বাভাবিক অবস্থায় আমি ঘুমের মধ্যে নাক ডাকি না।
যাইদ ভাই বলে চললেন,
"আগেও তো বেশ কয়েকবার ঘুমিয়েছিলে, তখন অবশ্য নাক ডাকতে শুনিনি। যদিও তোমার নাক ডাকার শব্দ ততটা তীব্র নয়। গভীর ঘুম হলে নাক না ডাকা মানুষদের নাকও মাঝেমাঝে খুশিতে ডেকে ওঠে। অতএব, অকারণ লজ্জায় নিজেকে আর রাঙাতে হবে না।"
যাইদ ভাই বরাবরের মতই মনের অনুভূতির ব্যাপারটুকু বেশ দ্রুতই ধরে ফেলতে পারলেন দেখে আমি হাসলাম।
হাতের বইটা বন্ধ করতে করতে যাইদ ভাই বলে ওঠলেন,
"প্রত্যেকটা মানুষেরই একটা নিয়তি থাকে, এবং তা বাস্তবায়িত হয় ঘটনাচক্রে।"
আমার বুঝতে অসুবিধা হলো না, উক্তিটি তিনি তাঁর হাতের বইটি থেকেই উদ্ধৃত করেছেন। বিছানা থেকে পা নামিয়ে রাখলাম। ঘুম জাগার পর ঘুমানোর পূর্বের অনুভূতিগুলো মানুষকে পুনরায় গ্রাস করে নেয়। আমার ঘুমানোর পূর্বের বিষণ্ণ ভোঁতা অনুভূতিটি যেন ধীরে ধীরে ফিরে আসতে লাগল। আবারও আমি ঝিমিয়ে পড়লাম। ডান উরুর উপর ডান কনুইয়ের ভরে ডান হাতের মাঝে নিজের থুঁতনিটুকু রাখলাম।
যাইদ ভাইয়ের দিক থেকে পেছন ফিরে থাকায় লক্ষ করিনি যে তিনি রুমে নেই। আমি সেই উত্তরী জানালা দিয়ে বাইরে দৃষ্টি ফেললাম। ঘরটা ঠাণ্ডা। টিনের ছাদ। বাইরের আকাশ সেই দুপুরবেলার মতই ঝকঝকে রোদের সাথে মসৃণ হয়ে আছে। মাঝেমাঝে ব্যস্ত চঞ্চল ভঙ্গিতে কাক উড়ে যাচ্ছে। মসৃণ নীল আকাশের মাঝে একটা চাররঙা ঘুড়িকে উড়তে দেখে আমারও কেন যেন খুব ইচ্ছে হতে লাগল যেন সেই ঘুড়ির নাটাইটা হাতে তুলে নিই। এই বস্তুটি জীবনের কোনো পর্যায়ে কখনও উড়ানো হয়নি। মনপ্রাণ বিক্ষিপ্ত থাকলে যা হয় আর কি, অদ্ভুত অপ্রচলিত রকমের ইচ্ছেগুলো মনের কোণে জেগে ওঠতে চায়।
.
"তুমি কি হাতমুখ ধুয়ে নেবে, নাকি বাসিমুখেই 'বিছানা চা' নেবে? মানে যাকে বড়লোকেরা আদিখ্যেতা করে 'বেড টি' ডাকে আর কি।"
পেছন ফিরে তাকাতেই দেখি যাইদ ভাই একটি মেলামাইনের ট্রে'তে দু'কাপ চা নিয়ে এসেছেন।
"হাতমুখ ধুয়ে নিতে চাইলে ধুয়ে নিতে পার। দরজার পাশে পানির বালতি আর মগ আছে। কুলি করার সময় সাবধানে ফেলবে। অবশ্য ছাদের ওপরেই কুলি করে নিতে পার। ছাদটা রোদের তাপে তেঁতে আছে। তোমার কুলির পানি ছাদে পড়ার আগেই বাষ্প হয়ে যাবে।"
যাইদ ভাইয়ের কুলিসংক্রান্ত রসিকতায় হেসে ওঠলাম। হাতমুখ ধুয়ে এসে হাতে চায়ের কাপ নিয়ে যাইদ ভাইয়ের মুখোমুখি বসে আছি। তাঁর চোখে এখনও চশমা। তিনি আমার মত করেই অল্প অল্প চুমুক দিচ্ছেন চায়ের কাপে।
"তুমি হয়ত ভাবছ চায়ের সাথে তোমাকে আর কিছু দেইনি কেন। এর কারণ আছে। তোমাকে নিয়ে এক জায়গায় বের হব। যেখানে যাব, ওখানে বেশ কয়েকবার চা-নাস্তা করা যাবে।"
আমি চায়ে চুমুক দিয়েই কিছুটা কাতর স্বরে বললাম, "যাইদ ভাই, আজ কোথাও না গেলে হয় না।"
"না, অবশ্যই হয় না। তুমি আমার সাথে বের হবে। আমারও ভালো লাগছে না ঘরে বসে থেকে। একটু চড়েবড়ে আসি।"
.
চকবাজার নামলাম। চৌরাস্তার মাঝেই। ব্যস্ত পরিবেশ। আশেপাশে বেশ কয়েকটি শপিং মল, এবং সড়কের পাশেই প্রচুর লাইব্রেরির দোকান। মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ার মত। শহুরে ব্যস্ততা যেমন হয় আর কি। কেউ কারো দিকে তাকানোর প্রয়োজনও মনে করে না। সময় কোথায়!
যাইদ ভাইয়ের সাথে পা চালাতে চালাতে ফুটপাথ ধরে হাঁটছি। তিনি চুপচাপ হয়ে ছিলেন কিছুক্ষণ। এরপর মুখ করলেন, "তুমি তো গল্প লেখো। একজন নিবেদিতপ্রাণ গল্পকারের একটা বিশেষ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরো তো আমার কাছে।"
আমি আলোচনার মনমানসিকতায় ছিলাম না। মুখে চিরাচরিত হাসি ফুটিয়ে তুললাম। আমার এ হাসির অর্থ আমার প্রিয়জনেরা ধরতে পারেন। এবং যাইদ ভাই আমার প্রিয়জনদের মাঝে একজন। তিনি তাই আর কথা বাড়ালেন না।
"তুমি কখনও কোল্ড কফি ট্রাই করে দেখেছ?"
রাস্তা পেরিয়ে একটি স্ট্রিট ফুড কার্টের সামনে দাঁড়ালে যাইদ ভাই এই প্রশ্ন ছুঁড়ে দিলেন আমার দিকে। জবাবে দু'পাশে মাথা নাড়লাম।
“বলো কী! তাহলে আমি বলবো, তুমি খুব চমৎকার একটি বস্তুর স্বাদ হতে এখনও বঞ্চিত। চলো আজ ট্রাই করে দেখিয়ে দিই তোমাকে।”
‘Delicious Food Cart’ নামক ছোট আকৃতির ফুড কার্টটির সামনে বেশ ভীড়। অনেকে শৃঙ্খলিত হয়ে লাইন ধরেই দাঁড়িয়ে আছে। তবে লাইনের বাইরের মানুষও আছে। যাইদ ভাই লাইনের বাইরের মানুষ। আমাকে একপাশে দাঁড় করিয়ে তিনি অর্ডার করতে গেলেন দু’টো কোল্ড কফি। আমি একপাশে দাঁড়িয়ে থেকেই দেখতে লাগলাম কফি তৈরির প্রক্রিয়া।
তিনজন ছিলেন দায়িত্বে। এদের মধ্যে দু’জন ব্যস্ত কফি তৈরিতে, এবং অবশিষ্টজন ব্যস্ত দাম আদায় করতে। কফি দানা একটি ব্লেন্ডার পাত্রে ঢেলে তাতে পরিমাণমত চিনি, পানি ঢেলে ব্লেন্ড করা হলো। ব্লেন্ড হয়ে গেলে তাতে পাঁচ-ছয়টি আইস ব্লক ঢেলে দেয়া হলো, সাথে গুঁড়ো দুধ মেশানো হলো পরিমাণমত। এবার একজন এক প্যাকেট ডার্ক চকোলেট খুললেন এবং সেটি ভেঙ্গে ব্লেন্ডারে ফেলে দিলেন। আবার ব্লেন্ড করা হলো। এরপর দু’টি প্লাস্টিকের কাপে সেগুলো ঢেলে নিলেন তিনি। তাতে একটি স্ট্র ঢুকিয়ে কাজ সম্পন্ন করা হলো। দু’টো প্লাস্টিকের কাপ যাইদ ভাইয়ের দিকে এগিয়ে দেয়া হলো। দাম পরিশোধ করে কাপ দু’টি দিয়ে তিনি আমার দিকে এগিয়ে আসলেন।
আমার হাতে এক কাপ তুলে দিয়ে তিনি বললেন, “যদি তৃপ্ত না হও, তাহলে সত্যি বলছি, আমি এখানে আর কাউকে কখনও নিয়ে আসব না।” যাইদ ভাইয়ের এই কথার অর্থ বেশ স্পষ্ট। এই কোল্ড কফির স্বাদের চমৎকারিত্বের ব্যাপারটি নিয়ে তিনি যে একেবারেই নিঃসন্দেহ, সেটি তাঁর এমন জোর গলার দাবী।
স্ট্র’তে ঠোঁট চেপে চুমুক দিতে লাগলাম। আমার কাছে মনে হলো, এক শীতল অমৃতধারা আমার খাদ্যনালী হয়ে ভেতরটায় প্রবাহিত হয়ে যাচ্ছে। এমন চমৎকার স্বাদের কোল্ড কফি আমি আগে কেন পান করিনি, তার জন্যে একমুঠো আফসোস হলো আমার মনে। আমি লক্ষ্য করলাম, আমার মনের বিষণ্ণতাও অনেকখানি কমে কমে আসছে। এটি আমাকে বেশ বিস্মিত করলো। তাহলে কি মনের যাবতীয় বিষাক্ত অনুভূতিগুলো খাওয়াদাওয়ার ফলেও মন থেকে মুছে যায়? আমার এ প্রশ্নের উত্তরটা আমি একটু পরেই পেয়েছিলাম।
আমার পরিতৃপ্ত মুখ দেখে যাইদ ভাই বিজয়ের হাসি হাসলেন। বাচ্চাদের মত নিষ্পাপ হাসি। আমি মুগ্ধ হলাম। এবং তখন আরেকবার লক্ষ্য করলাম, তার চোখে তখনও চশমা। কী আশ্চর্য! এতক্ষণ ধরে কি তাঁর চোখে চশমা ছিল না?
“তানসীর, তুমি হয়ত ভাবছ এতক্ষণ আমার চোখে চশমা ছিল কি ছিল না। আমি ব্যাখ্যা করি? চোখে চশমা ছিলই। তবে তুমি বেশ বিষণ্ণ ছিলে কি না, তাই তা লক্ষ্য করনি। সেই শুরু থেকেই তুমি বিষণ্ণ। তবে আমি আশা করি তোমার বিষণ্ণতা এখন বেশ কেটে গিয়েছে, তাই না?”
আমি এর জবাব দিলাম না। আমার কফি তখনও শেষ হয়নি।
সেদিন যাইদ ভাই আমাকে একটি লাইব্রেরিতে নিয়ে যান। চকবাজার থেকে সামান্য দূরেই, জামাল খান মোড়ের দিকে। প্রেসক্লাবের সাথে লাগোয়া। সেদিনের আগে আমি কখনও কোনো লাইব্রেরিতে যাইনি। তাই এতসব বইয়ের মাঝে আমি ডুবে গেলাম একরাশ মুগ্ধতা নিয়ে। আমাকে আমার মত ছেড়ে দিলেন যাইদ ভাই।
পরবর্তী আড়াইটি ঘণ্টায় আমি দু’টো বই পড়ে শেষ করলাম সেখানে দাঁড়িয়ে-হেঁটে-বসে। আমি একরকম ভুলেই গেলাম যে সেদিন দুপুরবেলায় আমি কতটা বিমর্ষবদনে ছিলাম। আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে যাওয়ার আগেই সন্ধ্যে নেমে যাওয়ায় যাইদ ভাই আমাকে টেনে নিলেন। বের হওয়ার পর তিনি আমার দিকে তাকিয়ে বললেন, “বই পড়ার সময় তোমাকে কিন্তু বেশ ভালোই দেখায়। একটা সাদা চশমা কিনে নিও। পড়াকুদের মতই লাগবে।”
যাইদ ভাইয়ের চোখে চশমা দেখে আমিও বললাম, “আপনাকেও খারাপ দেখায় না চশমায়। কমবয়েসী প্রফেসরের মত লাগছে।”
আকাশে তখন মেঘ জমতে শুরু করেছে। তবে এটা এমন মেঘ, যাতে বৃষ্টি হয় না। তাই আমরা নিশ্চিন্ত মনেই ফুটপাতের পাশে একটি ডিম-পরোটার ভাসমান দোকানের সামনে দাঁড়ালাম। ডিমপোচ আর পরোটা খাব। প্লেট এগিয়ে দেয়া হলো। পরোটা ভেঙ্গে তাতে ডিমের অংশ নিয়ে মুখে পুরে দিতে লাগলাম। খেতে খেতেই যাইদ ভাই জিজ্ঞাসা করলেন,
“এখন একটু হালকাবোধ হচ্ছে না?”
আমি মাথা নেড়ে সায় দিলাম।
“তাহলে বোধহয় এখন একজন গল্পকারের বিশেষ বৈশিষ্ট্যটুকু আমার সামনে তুমি তুলে ধরতে পারবে? তাই না”
আমি চিবোতে চিবোতেই হাসলাম। “হ্যাঁ, যাইদ ভাই, সেটা পারব।”
“ঠিক আছে, বলতে থাকো।”
আমি একটু প্রস্তুতি নিয়ে বলতে লাগলাম,
“আমার কাছে মনে হয়, একজন গল্পকারকে কখনও নিভৃতে থাকা উচিত না। তার কখনও বিষণ্ণ, বিমর্ষ থাকাও উচিত না। গল্প লেখার প্রতি ভালোভাবে গুরুত্ব দিতে চাইলে তাকে চার দেয়ালের গণ্ডি থেকে বেরোতে হবে। মানুষের সাথে প্রয়োজনের বাইরেও মিশতে হবে। সে যেমন দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাবে, তেমনি অদর্শনীয় স্থানগুলোতেও যাবে। সে যেমন বিলাসবহুল ফ্ল্যাটে যাবে, তেমনি বিধ্বস্ত বস্তিতেও যাবে। সাধুজনের সাথে তার যেমন সখ্যতা থাকবে, তেমনি থাকবে অসাধুজনের সাথেও। এভাবেই তার গল্পের চরিত্র আরো জীবন্তরূপে গড়ে ওঠবে। সেগুলো সতেজ হবে, সেগুলোতে কোনো মেকি ভাব থাকবে না।
গল্পকারের বিষয়টা তাই চমৎকার। কারণ, সে গল্প লেখার উছিলাতেই সকল শ্রেণির মানুষের সাথে মিশে। এতে করে সে পৃথিবীর প্রকৃত রূপটুকু চেনে। যা তাকে বাস্তববাদী হতে বেশ সাহায্য করে। আপনি তাই কোনো গল্পকারকে দেখবেন, হয়ত সে দেখতে বেশ সাদামাটা, তবে সে আবেগপ্রবণ নয়। বাহিরের কাঠামো দেখে তার ভেতরের পুরো জটিল জগতটিকে একেবারেই চেনা বা বুঝা যাবে না। আমার দৃষ্টিতে একজন গল্পকারের বিশেষত্ব এটাই।”
যাইদ ভাইয়ের প্লেট খালি হয়ে পড়েছিল। আমার খাওয়া শেষের অপেক্ষায় তিনি দাঁড়ালেন। দাম পরিশোধ করলেন। আমার খাওয়া শেষ হলো।
সেদিন বাসায় ফেরার পর যাইদ ভাইয়ের বলা কথাটাই মাথায় ঘুরতে লাগলো। বিদায়ের আগে হাঁটতে হাঁটতে নানান কথার ভীড়ে তিনি আমাকে কথাগুলো বলেছিলেন।
“শোনো, তুমি যে ব্যাখ্যাটা দিয়েছ, তা অনেকটাই যথার্থ। তবে এই ব্যাখ্যানুসারে তুমি নিজেই এখনও প্রকৃত গল্পকার হয়ে ওঠতে পারনি। আমি একটা বিষয় লক্ষ্য করেছি, তুমি নিজেকে বাস্তববাদী হিসেবে পরিচয় দিলেও অনেক সময় তুমি বেশ আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ো। আবেগের অস্তিত্ব আমি অস্বীকার করছি না। আমি কট্টর বস্তুবাদী না। তবে ছোটখাটো বিষয় নিয়ে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়াটাকে এবং তার জন্যে সমস্ত কাজকর্মকে স্থবির করে দেয়ার প্রবণতাকে সমর্থন করি না। এটা ছেলেমানুষি আবেগ। এটা অপরিপক্বতার লক্ষণ। তোমাকে এই অপরিপক্বতা থেকে বেরিয়ে আসা লাগবে। কারণ, তুমি গল্পকার হতে চাও। গল্পকার হওয়ার আগে একজন শক্ত হৃদয়ের মানুষ হওয়াটা আরো বেশি জরুরী। তাই ছোটখাটো আবেগগুলোকে পাশ কেটে যেতে শেখো। কোনো নির্দিষ্ট মানুষের জন্যে বা তার ব্যবহারে বিষণ্ণ হয়ে পড়ো না। বেশিরভাগ মানুষই তোমার আবেগকে খুব একটা মূল্য দিবে না। খুব বেশি আবেগতাড়িত হয়ে পড়লে প্রয়োজনে কবিতা লিখবে, গান শুনবে বা গাইবে, তবে বিছানায় পড়ে থেকে দুঃখবিলাসে ডুবে থাকবে না। সবসময় তোমার যাইদ ভাই তোমার পাশে নাও তো থাকতে পারে, তাই না?”
আমি আমার ঘরের জানালা দিয়ে বাইরে তাকালাম। আকাশের মেঘগুলো বৃষ্টিরই মেঘ ছিল। এখন তা ঝরে ঝরে পড়ছে। আমি স্রষ্টার কাছে কৃতজ্ঞ হলাম। তিনি আমার চারপাশে অসংখ্য না হলেও হাতে গোনা চমৎকার কিছু মানুষকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এবং আমি বুঝতে পারলাম, কোল্ড কফি নয়, যাইদ ভাইয়ের আন্তরিক ভালোবাসাই আমার বিষাক্ত অনুভূতিটুকুকে স্তিমিত করে এনেছিল। বাইরের ঝিরিঝিরি বৃষ্টিসঙ্গীত একটি শীতল অনুভূতি জাগিয়ে তুললো আমার মনে। অনেক দূরের পথ এখনও পাড়ি দেয়া বাকি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন