আমার পাহাড়ের জীবন


পাহাড় ও নদী দেখে আমার বেড়ে ওঠা। আমি পাহাড়ের মানুষ। যেই পাহাড়ি এলাকায় থাকি ঠিক তার ওপারে নেমে গেছে ফেনী থেকে আসা নদীটি।যার নামে বয়ে গেলো ফেনী নদী হয়ে। ফেনী জেলার বড়ো একটা অংশ দখল করে ঢুকে পড়লো আমার গ্রামে। গ্রামের বাজার থেকে খানিকটা পশ্চিমে এই নদী নারীর মতোর আঁচল বাঁকিয়ে বয়ে গেছে সুদূর সমুদ্রের দিকে। সমতল থেকে ঢেউয়ের মতোন কিছুটা উঁচু পাহাড়ে আমার ঘর। এই পাহাড়ের পাদদেশে বাড়ির পাশ ঘেঁষে সচ্ছ পানির স্রোতে ছলছল বয়ে যাওয়া লক্ষ্মীছাড়া। আমার শৈশব ও কৈশোর কাল কেটেছে নদী ও পাহাড়ি ছড়ার কোলে। ঠিক মায়ের কোলের মতোন। এই ছড়ায় পাড়ার ছেলেদের সাথে গোসল করতে যেতাম। অবেলায় চলে যেতাম মাছ ধরতে। কতো হৈ-হুল্লোড় জীবনের স্মৃতি পড়ে আছে এখানে। স্মৃতির অনেকটা দখল করে আছে এই ছড়াটা। আমার জীবনে পাহাড় ও ছড়া মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। যেখানে যাই এই দুইটা জিনিশ আমার মনে সুখস্মৃতি জাগায়।
এই যে আমার পাহাড় ভালোলাগে এইটা সম্ভবত বাবার জীবনের অকৃত্রিম প্রভাব। বাবা পাহাড় ভালোবাসতেন ভীষণ রকম। নয় তো সমতলের জীবন ছেড়ে পাহাড়ে এসে ঘর বাঁধতেন না। বাবার পাহাড় ভালোলাগার কারণ হলো তিনি বন বিভাগে চাকরি করতেন। চাকরির সুবাদে ঘুরে বেড়িয়েছেন দেশের বিভিন্ন পাহাড় ও বনাঞ্চলে। দেখেছেন বহু নদ-নদী। এই বন-পাহাড়ের মায়াই হয় তো বাবার জীবনের আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ছিলো। প্রকৃতিকে ভালোবেসে থেকে যাওয়া মানুষের মন ও জীবন সুন্দর হয়। প্রকৃতির মতো সহজ ও সরল হয়। যেটার প্রভাব দেখেছি বাবার যাপন করা জীবনে। যেটুকু সময় বাড়িতে থাকতেন শাক-সবজি ও বিভিন্ন রকমের চারা লাগাতেন। পরিচর্যা করতেন। এই জিনিশটা বাবার চাকরি জীবনে যেখানে বদলি হয়েছেন শখ ও পরিকল্পনা মাফিক শুরু করতেন। সকাল বিকাল এসবের দেখভাল করতেন। সময় পার করতেন।
এখন বাবা নেই। বাবা মূলত পাহাড় ও নদী পাড়ের মানুষ ছিলেন। সাঙ্গু ছিল বাবার জীবনের সঙ্গী। এইসব জীবন রেখে রিজিকের তাগিদে বাবা হাঁটলেন ভিন্ন পথে। তবে শখ মরে যায়নি বলে সেই শখ ও স্বপ্নে আবারো ফিরলেন পাহাড়ে। এই বাবার জীবনের অকৃত্রিম প্রভাব আমার ভিতরে কেমন অজানা হাহাকারে তোলপাড় তৈরি করে। পাহাড় ও নদী দেখলে বাবার কথা ভীষণ রকম মনে পড়ে আমার। বাবার সাথে আমার জীবনের যে সুখস্মৃতি তা বুকে বয়ে বেঁচে আছি প্রতিনিয়ত। আগের দিনে তৈরি টিনের ঘরের সাথে আরো দুইটা কামরা যুক্ত হয়েছে নতুনভাবে। আমার পরিচিত মানুষ ও বন্ধুরা অনেকেই জানেন এই বাঁশ ও টিনের তৈরি ঘরের গল্প। পুরো ঘরটা এখন স্মৃতি হয়ে আছে, অথচ বাবা নেই আমার জীবনে। আমি মাঝে মাঝে বেশ ভাবনায় পড়ি, বাবা কিভাবে এমন নির্ভেজাল ও নির্মোহ জীবন পার করে দিলেন পাহাড়ের জনপদে।
বাবার জীবদ্দশায় একটা দিনের কথা আমার মনে সুন্দর স্মৃতি হয়ে আছে। তখন উঠোনে ডালপালা মেলে একটা জলপাইয়ের গাছ দাঁড়িয়ে ছিলো। তীব্র রোদের দিনেও এই গাছটা টিনেরচালা ঘর ও উঠোনে ছায়া দিয়ে রাখতো। এখন তার কিছুটা সামনে আমার হাস্নাহেনার গাছটা ঝোপের মতো দাঁড়িয়ে আছে। এই শীতের রাতে কুয়াশা মেখে সৌরভ ছড়াচ্ছে বাড়িতে। বাবা বাড়িতে ছিলেন। সবুজ ও সতেজ জলপাই গাছের নিছে চেয়ার পেতে বসে আছেন। দুই পা জোড় করে বেশ আরাম ও আয়েশে বসতেন। সামনে ছোট একটা টি-টেবিলে কি যেন রাখা ছিলো। পায়ের উপর পা তুলে খাচ্ছিলেন, সে আর মনে নেই। আমি চট্টগ্রাম শহর থেকে বাড়িতে আসতেই বাবার মুখে জান্নাতি হাসি ফুটে উঠলো। মুখ ভর্তি শাদা-কালো দাঁড়িতে এক শুভ্রতা ছড়ালো বাড়ির আঙিনা জুড়ে। আমিও বাবার সাথে বসে পড়লাম। বেশ ফুরফুরে মেজাজে আলাপ জুড়লেন। আমার ভাবনায় আটকায়, বাবার মনে এমন একটা শখ ছিলো পাহাড়ে ঘর বেঁধে আরাম করে আড্ডা দেয়ার। যার কিঞ্চিৎ ভেসে ওঠে তাঁর জীবনের পরতে পরতে। হাস্যোজ্জ্বল জীবনের ভেলায়।
এই পাহাড়ে ঘর হওয়ার সুবিধা হলো সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে যে পরিমাণ পাখির কিচিরমিচির ও সুর শোনা যায় তা বাবা উপলব্ধি করতেন। এমন দৃশ্য অন্য অনেক গ্রামেও পাওয়া যায় না। একেক পাখির ডাক, ভঙ্গিমা ও সুর আলাদা রকমের। এসবে পাহাড় ও প্রকৃতি দেখার আনন্দ দুনিয়ায় জীবনে আর নাই। এইজন্যই বোধহয় মানুষ টাকাপয়সা খরচাপাতি করে আমার চট্টগ্রামে, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে যায়। যেই মনোরম প্রকৃতির দৃশ্য আমি হরহামেশাই দেখি। গ্রামে পাহাড়ের বাড়ি থেকে দক্ষিণে গেলেই সবুজের সমারোহ আর বিস্তীর্ণ জলজমি। এই পাহাড়েই বনমোরগের ডাক থেকে কতো রকমের পাখির ডাক যে শুনি তাঁর ভাষা লেখা ও বলায় প্রকাশ করা যাবে না। এইসব জীবনের আনন্দ ও সুখস্মৃতি অনুভব করা যায়, প্রকৃতিরে অবুঝের মতো ভালোবাসা যায়।
আমার একজীবনরে মুগ্ধ করে রাখে পাহাড় ও নদী। এইসব আমারে ভীষণ রকম টানে। দেশের যেখানে সফরে যাই আগেই নদী দেখি আমি। সফরের সঙ্গীরা কিছুটা আঁচ করতে পারেন হয়তো। শহরের দেয়াল ও দালানের চেয়ে আমার গ্রামের জীবনে প্রশান্তি লাগে। গ্রামে মানুষের মন, মাটি ও প্রকৃতির মতো সবুজ ও সতেজ দেখে হারিয়ে যাই। যে গ্রামে জঞ্জালের বাইরে ফুরফুরে একটা মন নিয়ে সকাল শুরু হয়। গ্রামের জীবনের চেয়ে সুন্দর কোন জীবন নাই। আমি বাবার মতো নির্মোহ একটা জীবন পার করতে চাই, গ্রামের শান্ত ও শীতল বয়ে চলা নদীর মতোন। নির্ভেজাল প্রকৃতির ছায়ার মতোন। এই পাহাড় ও নদী ভালোবেসে বাবার মতোন ছায়া সুনিবিড় গ্রামের আলো ছায়ায় ঘুমিয়ে যেতে চাই।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন