
শুভ্র মেঘের শরৎ
শীত নেই। তবুও কুয়াশা ঝরছে। শরতের সকালটা এমন। সকাল পেরুতেই দেখা যায় শাদা মেঘের উড়াউড়ি আকাশে। বদলে যায় আকাশে উড়ন্ত মেঘের রঙ। কোথাও নীল আবার কোথাও শুভ্র মেঘ। ঘনকালো মেঘে ছেয়ে থাকা আকাশ এখন শুভ্র মেঘেদের দখলে। থেমে থেমে উড়ে যায় মেঘ। ভেসে ওঠে নীলাভ মেঘের আকাশ। কোথাও আলো আর কোথাও ছায়া। এই রৌদ্র ছায়ার খেলায় উড়ে যায় প্রজাপতি কিংবা পাখিদের দল।
শরতে রাতের রূপালি আলোয় উজ্জ্বল হয়ে থাকে সারা পৃথিবী। রাতভর সুভাষ ছড়ায় মৌসুমের নাম না-জানা হাজারো ফুল। জলজমি কিংবা নদীর ধারে ফুটে থাকে সারি সারি কাশফুল। বাড়ির আঙিনায় ফুটে থাকে শিউলি-জবা। খাল-বিল, পুকুরে ভাসতে থাকে অসংখ্য মনোহারি ফুল। এই শরতের দিনে যেদিকে তাকাই যেন শাপলার বিল। শিশির ঝরা ভোরের শিউলি, নদীর কাশবন আর জলাভূমির শাপলা-শালুকে আসে শরতের রূপ। ঋতু বৈচিত্র্যের পালাবদলে আসে শরৎ। বাংলায় এই ঋতুর পরিবর্তনে আমাদের মাঝে হাজির হয় নানান বৈচিত্র্য। শ্রাবণের ধারা শেষে আকাশ যেন সেজে উঠে শরতের শুভ্রতায়। আকাশ জুড়ে শাদা শাদা মেঘেদের মিতালি। গ্রাম বাংলার বিল-ঝিলে ফুটে শাপলা-শালুক আর পদ্ম। শিশু-কিশোরেরা ছুটে দুরন্তপনায় এমন বাংলার রূপ দেখতে।
পাটের দিন শেষে শরত এলে কৃষকেরা পড়ে থাকে ধানের জমিতে। দূর্বাঘাসের আলে হাঁটে রাখালের দল। শরতের দিন আনে নতুন আমেজ। বাতাসে বাতাসে দোল খায় ধানের চারা। দোল খায় জমির কিনারে জেগে উঠা কাশের ফুল। অথই সবুজের মাঝে শাদা কাশের দোলা আকুল করে তোলে মানুষের মন। কাশবনের ফাঁকে উঁকি মারে শাদা বকের ঝাঁক। নদীর কূল বা বিলের কিনারে পাহারা দেয় পুঁটির পোনা। শাদা কাশের আড়ালে লুকোচুরি খেলে পাখিদের দল।
এসব দিন আসে শিশিরের ভোরে। শিউলির ফুলে। ফুলের মৌ মৌ ঘ্রাণে জেগে উঠে পাড়াগাঁয়ের শিশু-কিশোরেরা। শিউলির মালায় গাঁথে রঙ- বেরঙের স্বপ্ন। মক্তবে ছুটে যাওয়া গ্রামের মেঠো পথের ধারে ছড়িয়ে থাকে শিউলির ফুল। শিশিরের ফোঁটায় গ্রামের মেয়েরা আলতো করে কুড়িয়ে নেয় ওড়নায়। শরতে শিউলির দিন যেন চিরচেনা বাংলার বৈচিত্র্য নিয়ে হাজির হয়। সকালের কোমল হাওয়া। শুভ্র আকাশের অপরূপ সৌন্দর্য্যে ভরপুর হয়ে থাকে শরৎ। বেলা গড়াতেই শুরু হয় রৌদ্র ছায়ার খেলা। দূর গাঙে ভেসে যায় পাল তোলা নৌকার সারি। শোনা যায় মাঝিদের মুক্ত গলার গান। শরৎ এসে প্রকৃতিকে সাজিয়ে দেয় অপার সৌন্দর্যে। বাঙালির ঘরে ঘরে সঞ্চার করে নতুন প্রাণের। প্রকৃতি মেতে উঠে রঙের খেলায়। শাদা আর সবুজ নীলে প্রকৃতি সাজে শিশিরের স্নিগ্ধতায়। শরতের রূপ নিয়ে হেসে উঠে গ্রাম বাংলা।
শরতে শ্রাবণের দিন শেষে আশ্বিন আসে। শরতের শুভ্রতায় জেগে উঠে সকাল। বাংলার ঋতু বৈচিত্র্যের বদলে শুরু হয় এক অন্যরকম আনন্দ। শরতের ভোরে শিশিরের ভিজে থাকা নিয়ে আসে শীতের আগমনী বার্তা। গাছে গাছে ফোঁটা ফোঁটা জল টপটপ ঝরতে থাকে। শিশিরের জলে হেঁটে যায় বনের ডাহুক কিংবা অচেনা পাখি। বিলের নিটোল জলে বসে থাকে মাছরাঙা। বিকেলের সোনা রোদ হাসি দেয় কাশের ফাঁকে। ঘুঘুর ডাকে নেমে আসে গোধূলি। বিকেলের পাঠ। দিগন্তে সূর্যের অস্তে ভেসে ওঠে লালিমা। পৃথিবীতে নেমে আসে শিশিরের সন্ধ্যা।
আপনার মন্তব্য লিখুন