
ঝিলাম নদীর দেশ
প্রচ্ছদ থেকে -
“প্রত্যেক কবি যেমন তার নিজস্ব নারী নির্মাণ করেন, ঝিলাম ও তাই❞
◼️ বিষয়বস্তু
ঝিলাম নদীর দেশ' বইটি লেখকের কাশ্মীর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে লেখা। বুলবুল সরোয়ার ১৯৮৬ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে কাশ্মীর ভ্রমণ করেন। তার সেই ভ্রমণের রোমাঞ্চকর অনুভূতিগুলোকে মলাটবন্দী করেন ১৯৮৭ সালে। যা ১৯৯০ সালে বই আকারে প্রকাশ করে সৃজন প্রকাশনী। বইটি এ পর্যন্ত একান্ন বার মুদ্রিত হয়েছে।
বইটিতে মূলত কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য, দর্শনীয় স্থান, ভাষা ও সংস্কৃতি, কাশ্মীর সংকটের বিভিন্ন দিক, এ অঞ্চলের মানুষের অতিথিপরায়ণতা আর স্বাধীকারের আর্তনাদ ফুটে উঠেছে।
◼️ বই সম্পর্কে
'ঝিলাম নদীর দেশ' বলতে বুঝানো হয়েছে কাশ্মীরকে। ঝিলাম হচ্ছে একটি নদীর নাম, যা ভারত ও পাকিস্তানের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গেছে। ঝিলাম নদী কাশ্মীরকে দুটি ভাগে ভাগ করেছে।
এক. পাকিস্তান নিয়ন্ত্রিত আযাদ কাশ্মীর
দুই. ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু কাশ্মীর।
এই কাহিনী ভারত নিয়ন্ত্রিত জম্মু (পরাধীন) কাশ্মীর ভ্রমণের অভিজ্ঞতা।
কাশ্মীর! নামটা শুনলেই মনের দৃশ্যপটে জেগে উঠে বরফের টুপি পরে অন্তহীন অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকা পর্বতশৃঙ্গ , মেঘ আর পাহাড়ের মিলনমেলা, অতন্দ্র প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকা পাইন গাছের বিশাল দেওয়াল, তুষারের সাদা চাদর, সারি সারি চিনার বৃক্ষের সগৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকা, আরো কত কি!
সাধে কি সম্রাট জাহাঙ্গীর বলেছেন---
“ঘর ফেরদাউস রুহে জামিন আস্ত,
হামিন আস্ত, হামিন আস্ত, হামিন আস্ত।
অর্থাৎ যদি জমিনের বুকে কোন জান্নাত থাকে তবে সে জান্নাত এখানেই রয়েছে।
কাশ্মীরের সৌন্দর্য লিখতে গিয়ে, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায় বলেছেন,
❝একটা সূর্য ডোবার যে রঙ তার সব সৌন্দর্য কি লেখায় আসে? লিখতে গিয়ে বড্ড দুর্বল লাগে। দেখেছি, অনুভব করেছি, আনন্দিত হয়েছি। সেটা আর পাঁচ জনকে বোঝাই কেমন করে?”
কিন্তু যে কাশ্মীরকে বলা হয় পৃথিবীর স্বর্গ, যে কাশ্মীরের নৈসর্গিক সৌন্দর্য যুগে যুগে মুগ্ধ করেছে ভ্রমণ পিপাসুদের, যে কাশ্মীরের সৌন্দর্য বর্ননা করতে গিয়ে ভাষা হারিয়েছেন অসংখ্য কবি সাহিত্যিক। কখনো কি আমরা সেই কাশ্মীরের মানুষের দুঃখ বেদনাকে উপলব্ধি করতে পেরেছি?
ঝিলাম নদীর দেশে বইটিতে লেখক সেসবের কিয়দাংশ তুলে ধরেছেন। লেখক কাশ্মীরের দর্শনীয় স্থানগুলোর বর্ণনার পাশাপাশি এর পেছনের ইতিহাস এবং সেই সাথে পরাধীন কাশ্মীরের মানুষের দেশপ্রেম এবং তাদের আন্তরিকতাকে কলমের আঁছড়ে তুলে এনেছেন। লেখকের মতে, কাশ্মীরের মানুষের দেশপ্রেমের একটা আলাদা দ্যুতি আছে।
কাশ্মীর কোনো দেশের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে নেই। নেই এ অঞ্চলের মানুষের ভোট দেবার অধিকার। এমনকি তারা জানেনা তাদের অনাগত সন্তান স্বাধীনতার স্বাদ পাবে কিনা! তথাপি তারা দুঃখ কষ্টকে বুকের নিচে চাপা দিয়ে হাসতে শিখেছে। বুকের ভেতর আযাদীর আকাঙ্ক্ষা সযত্নে পুষে রেখে হাসি মুখে জীবন পার করে দিচ্ছে।
কাশ্মীরের নয়াভিরাম সৌন্দর্যের পাশাপাশি লেখকের বর্ণনায় আর ও উঠে এসেছে কাশ্মীরের ভৌগলিক অবস্থান। সেই সুদূর অতীতে সম্রাট অশোকের সময় থেকে শুরু করে হর্ষবর্ধন, সেন রাজা, পাল রাজা, মুসলিমদের উদ্ভব, মোঘল শাসন, ব্রিটিশ আমল, শেরে কাশ্মীরের বিশ্বাসঘাতকতা, এবং সর্বশেষ কাশ্মীর নিয়ে ভারত পাকিস্তান দ্বন্ধ কিছুই বাদ যায়নি।
এছাড়া ও কাশ্মীরের লোক কবি লালদেদ, হাব্বা খাতুন, মাহমুদ জামী, রাসূল মীর, পরমানন্দ, গুলাম আহমেদ মাহজুর, জিন্দা কাউল, দীনা নাথ, মীর্জা আরিফ সহ আরো কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিদের জীবনাচরণ ছোট্ট পরিসরে তুলে ধরেছেন তিনি।
এজন্য পুরো ভ্রমণবৃত্তান্তটিকে লেখক পনেরোটি অধ্যায়ে ভাগ করেছেন। প্রতিটি অধ্যায়ে ভ্রমণকৃত স্থানের প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের বর্ণনার সাথে লেখক সেই জায়গার অজানা ইতিহাসের সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন। সেই সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন সুদূর ইরান থেকে ছিটকে আসা এক গোলাপ কুড়ি মেহেরুন্নেসা ওরফে নুরজাহানের সাথে। যার রুচিশীলতা শুধু সম্রাট জাহাঙ্গীরকেই নয়, প্রভাবিত করেছিলো তার অধস্তন আত্নীয় বান্ধবদেরকেও। যার ফলাফল মুঘলদের স্থাপত্যশৈলী।
বুলবুল সরোয়ারের ভাষায়,
❝ মরুতৃষ্ণায় কাতর পিতামাতা একদিন যে মেহেরকে ফেলে এসেছিলো সিন্ধুর মরুভূমিতে, নিয়তির নির্দেশে সেই এসে ঠাঁই নিলো দিল্লীশ্বরের মনের গভীরে। যে হরিনীকে নিজেরাই মৃগনাভির সৌরভের উন্মদনায় ছুটে বেড়াতে হয় বন থেকে বনান্তরে এবং ধরা দিতে হয় মৃত্যু নামক শিকারীর ফাঁদে,সে হয়তো নিজেও জানেনা কস্তুরির কদর। কিন্তু মেহেরুন্নেসা জানতেন।
দুঃখ বেদনা বৈধব্যের মধ্য দিয়ে জীবনকে দেখেছিলেন বলেই হয়তো এই আত্নজাগরণ। আর তারই ফলে একজন প্রশাসকের মধ্যে জন্ম নিলো এক শিল্পীর আত্না এবং তারই ধারাবাহিকতায় পরিনত হতে হতে যার নাম হলো মুঘল শিল্পকলা।❞
লেখকের এমন চমৎকার ভাষাশৈলী দেখে আপনি মুগ্ধ না হয়ে পারবেন না। মুগ্ধতার পরিমাণ আরও বেড়ে যাবে যখন দেখবেন
প্রতিটি অধ্যায়ের শুরুতে এবং মাঝে লেখক তার মনের ভাব প্রকাশ করতে মির্জা গালিব, আল্লামা ইকবাল, হাফিজ, হাব্বা খাতুন, কাজী নজরুল ইসলাম, শামসুর রাহমান, আল মাহমুদ সহ বিখ্যাত কবিদের বাংলা ও ফার্সিতে লেখা অসংখ্য পংক্তিমালার ব্যবহার করেছেন।
লেখকের শক্তিশালী বর্ণনার সাথে আপনিও ঘুরে আসবেন গুলমার্গ,
শালিমার বাগ, নিশাত বাগ, খিলানমার্গ,চেশমা শাহী, ডাল লেক, নাগিন লেক, মানসবাল লেক, পেহেলগাঁম, শ্রীনগর, লিডার নদী আর ঝিলাম নদীর তীর থেকে। কাশ্মীরে লেখকের সাথে পরিচয় হওয়া আব্দুল্লাহ, আব্দুল আজিজ, নয়ীম, খোরশেদ, সাব্বির, আর্জুমান্দ, তাবাসসুমকে মনে হবে আপনারই বন্ধু।
মিশরীয় কন্যার কাজী নজরুল ইসলামের প্রতি ভক্তি ও শ্রদ্ধা দেখে বাঙ্গালি হিসেবে আপনি যেমন গর্বিত হবেন, তেমনি বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রাম নিয়ে কাশ্মীরের সাধারণ মানুষের ভুল ধারণা আপনাকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলে দিবে। পাকিস্তান সৃষ্টি ছিল
সমগ্র মুসলিম বিশ্বের স্বপ্ন। তাই পূর্ব পাকিস্তান আলাদা হয়ে যাওয়ায় তারা কষ্ট পেয়েছে। কাশ্মীরীরা ও তার ব্যতিক্রম নয়। তবে আমরা আশা করতে পারি একদিন তাদের ভুল ভাঙ্গবে।
এ সবকিছুকে ছাপিয়ে আপনি কাশ্মীর আর নাজনীনের প্রেমে পড়বেন।
◼️ পাঠ প্রতিক্রিয়া
ভ্রমণ কাহিনীর সাথে আমার সখ্যতা কম। মোটের উপর মাত্র দুখানা ভ্রমণ কাহিনী পড়েছি। কিন্তু 'ঝিলাম নদীর দেশে' বইটা পড়ার সময় কেবলই মনে হচ্ছিল আগে কেনো পড়িনি! পুরো বইটা একবার পড়ি, দুইবার পড়ি, বারবার পড়ি, অসংখ্য বার পড়ি, তবুও যেন পড়ার স্বাদ এতোটুকুও মিটবেনা। প্রতিবারই মনে হবে নতুন করে পড়ছি। নতুন করে এর রস আস্বাদন করছি।
কিছু কিছু বই পড়ার সময় আমি মনে মনে বলি 'আল্লাহ! না, এতো তাড়াতাড়ি যেন শেষ না হয়ে যায়! প্লিজ! ঝিলাম নদীর দেশে পড়ার সময় ও বারবার পূর্বোক্ত কথাগুলো বলছিলাম। কেনো এতো দ্রুত শেষ হতে হবে। আহা, মাত্র ১৯১ পৃষ্ঠা! এজন্যই কি জনৈক ব্যক্তি বলেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর জিনিসগুলো অল্প সময়ের জন্যই দেখতে পাওয়া যায়!
এই মুহূর্তে মনে হচ্ছে রবীন্দ্রনাথ, শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়, আল বিরুনী, সম্রাট জাহাঙ্গীর, মার্কোপোলো সহ আরো অনেক নাম না জানা কবি সাহিত্যিকদের কথা। কি চমৎকার করেই না তারা কাশ্মীরের রুপের বর্ণনা দিয়েছেন। মনের মাধুরী মিশিয়ে লিখেছেন কাশ্মীরের প্রকৃতির বর্ননা।
কি অপরুপ রুপসী সেই ঝিলাম। যেনো কোনো ভুবনমোহিনী সুন্দরীর রুপ অনায়াসেই স্নান হয়ে যায় ঝিলামের কাছে। তার সরু চিকন ঢেউগুলো যেকোনো সৌন্দর্য পূজারীর মনকে কিছুক্ষণের জন্য আনমনা করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট। শুধু ঝিলাম-ই নয়। কাশ্মীরের ভাঁজে ভাঁজে রয়েছে সৌন্দর্য। এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে মহান রাব্বুল আলামিনের অপূর্ব সৃষ্টির নিদর্শন।
হিমালয়ের মহত্ত্ব নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা গুলমার্গ, প্রকৃতির অসাধারণ লীলা বৈচিত্র্য পেহেলগাম, স্ফটিক নীল জলরাশির ডাল ও নাগিন লেক। সম্রাট শাহজাহান আর বাদশাহ জাহাঙ্গীর যাকে ডাকতেন মেহবুবা নামে। নুরজাহান যার নাম দিয়েছিলেন 'খোদা-কি-তোহফা', আওরঙ্গজেব তার ক্লান্ত জীবনের বহু রাত যে লেকের পাড়ে বিনিদ্র কাটিয়েছেন। যে ডাল ও নাগিনের নয়াভিরাম সৌন্দর্য দেখে শায়খ নূর উদ্দীন বলেছিলেন,
❝আমি যদি তোমাদের ভালোবাসতে শুরু করি,
জান্নাতের আকর্ষণ আমার কাছে স্নান হয়ে যাবে।❞
আর নাজনীন! চোখ যার কাজলের পাখায় ভর করে উড়ে যাওয়া দুটো বলাকা, ঈগলের ডানার মতো ভুরু, লাল হয়ে ওঠা নাক, আর তার হাসি--- হায়! খোদা সেখানে কি জানি কি আনন্দ বেদনার অপূর্ব সমারোহ ঘটিয়েছেন তিনিই জানেন।
ঝিলাম নদীর দেশে যে পড়েছে, সে কখনো নাজনীনকে ভুলতে পারবেনা। সে যেন এক টুকরো কাশ্মীর। দুঃখ আর বেদনার প্রচ্ছদে আঁকা গালিবের গজল। যার জন্য আনমনে বলে ফেলা যায়,
”যদি একবার প্রিয়ার সে মুখ দেখতে পেতাম হায়,
হায় খোদা! আমি কিয়ামত তক থাকতাম সিজদায়।”
----- শাহজাদা সেলিম [আনার কলির সমাধি লিপি থেকে]
বইটা পড়ার সময় একটা পাগলামি করেছিলাম। যখন যেই অধ্যায় পড়া শেষ করেছি তখনই সেই বিষয়ে ইউটিউবে যতগুলো ভিডিও সামনে পড়েছে সব দেখেছি। হাউজবোট, শিকারা, চেশমা শাহী, ডাল লেক, নাগিন লেক, গুলমার্গ, নিশাতবাগ, ঝিলাম, শ্রীনগর, পেহেলগাম, হযরতবাল মসজিদ এসব স্বচক্ষে দেখার স্বাদ এজন্মে মিটবেনা হয়তো। কিন্তু স্যাটেলাইট আর ক্যাবলের এই যুগে এদের ভিউজুয়াল প্রেজেন্টেশন দেখে দুদন্ডের জন্য অক্ষিযুগলকে শান্তি দেওয়ার সুযোগ কিছুতেই হাতছাড়া করতে চাইনে। নয়তো আজীবন আপসোসের সুরে বলতে হবে,
“নয়ন তোমারে পায়না দেখিতে..........”
সাধে কি আর সন্ন্যাসী হতে চাইছি! ওমন ভুবন ভোলানো সুন্দরীর রুপ না দেখে মরেও যে শান্তি নেই।
◼️ পাঠ পর্যালোচনা
ঝিলাম নদীর দেশ বইটি ভ্রমণ কাহিনী হলেও এর পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে লেখকের ব্যক্তিগত জীবনদর্শন, ইতিহাস, সাহিত্য, প্রেম, বিরহ আর হাহাকার।
তাই বইটিকে শুধুমাত্র নিছক ভ্রমণ কাহিনী ভেবে থাকলে পাঠক বিরাট ভুল করবেন। এটা শুধু ভ্রমণ কাহিনীই নয়, ভ্রমণ কাহিনীর আড়ালে এ বইয়ের প্রতিটি পাতায় লুকিয়ে আছে বিরহের করুণ সুর, ষড়যন্ত্র ও বিশ্বাসঘাতকতা, চাওয়া আর না পাওয়ার মধ্যে দ্বন্দ্ব, মুক্তিকামী একটি জাতির ৭৪ বছরের আর্তনাদ, আর এক সময়ের অর্থ বিত্ত আর জৌলুসে ভরা সমৃদ্ধশালী মোঘল সাম্রাজ্যের ইতিহাস!
লেখকের সহজ সরল অথচ অতিচমৎকার বর্ননাভঙ্গি নিমিষেই পাঠকের হৃদয়ে ছুঁয়ে যাবে। লেখক তার শব্দের জাদু দেখিয়ে প্রথম থেকেই আপনাকে ঘোরের মধ্যে ফেলে রাখবে। ঘোর শেষ হলে দেখবেন চোখের কোণে জল জমেছে। সেটা হতে পারে নাজনীনের জন্য, হতে পারে আজিজ, নয়ীম আর খুরশিদের জন্য, সর্বোপরি কাশ্মীরের হতভাগ্য মানুষদের জন্য।
সবচাইতে বেশি অবাক হবেন লেখকের সাহিত্য জ্ঞানের পরিধি দেখে। প্রতিটি অধ্যায়ে বাংলা, উর্দু আর ফার্সি কবিতার ব্যবহার বইটিকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। গদ্য আর পদ্যের সংমিশ্রণে ঝিলাম নদীর দেশ বইটি হয়ে উঠেছে কালজয়ী এক ভ্রমন উপন্যাস।
বাংলা সাহিত্যে বুলবুল সরোয়ারের পর আর কেউ ভ্রমণ কাহিনী রচনায় এতোটা মুন্সিয়ানা দেখাতে পেরেছে কিনা জানা নেই। এই একটা বই পড়েই বাকি জীবন আমার প্রিয় লেখকদের তালিকায় রাখতে চাই এই মানুষটিকে। সাহিত্যের প্রতি একেবারে উদাস যে মানুষ, সে ও সাহিত্যপ্রেমী হয়ে উঠতে পারে এমন বই পড়ে।
এ বইটি নিয়ে আর বিশেষ কিছু বলার নেই। যত বলবো ততই কম মনে হবে। অবশ্য, স্বয়ং সৈয়দ আলী আহসান যে বইয়ের মূল্যায়ন করে গেছেন সে বই সম্পর্কে কিছু বলার প্রশ্নই উঠেনা।
◼️ প্রিয় উক্তি
১। সংস্কারের শেকল থেকে মুক্ত না হলে মানুষ আসলে কিভাবে স্বাধীন হবে? স্বাধীনতা মনে তো কেবল অন্ন বস্ত্র বাসস্থানের নিশ্চয়তা নয়, বরং সামাজিক সুস্থতা ও অর্থনৈতিক মুক্তির মধ্যেই স্বাধীনতার আসল তাৎপর্য লুকিয়ে থাকে৷
২। জাতীয় পতাকা ও জাতীয় সঙ্গীতের আসলে কোনো তাৎপর্য নেই, যদি না তার সঙ্গে যুক্ত হয় দেশপ্রেম ও মাতৃভূমির মর্যাদার অনুভূতি।
৩। আপনি যা সৃষ্টি করতে পারেন না, তাকে ধ্বংস করার অধিকারও আপনার নেই।
৪। দুঃখ, যন্ত্রণা, হতাশা - এসব জীবনেরই অংশ। তাকে বরণ করে নেওয়ার মধ্যে কোনো পরাজয় নেই। পরাজয় হচ্ছে তা থেকে জেগে উঠার বাসনা ও প্রচেষ্টাকে ত্যাগ করা।
৫। দুনিয়াটাই এক যুদ্ধক্ষেত্র। সংসার, অফিস, আদালত, রাজনীতি সর্বত্রই লড়াই। অন্ধকার কখনোই জায়গা ছেড়ে দেবে না, প্রদীপকেই জ্বলে উঠতে হবে।
৬। বিশ্বাসের আলাদা একটি ভূগোল আছে, যা ভৌগলিক বা রাজনৈতিক সীমানার চেয়ে বহু বিস্তৃত।
৭। পাহাড়ে ওঠার নিয়ম হচ্ছে ধীরে চলো- যে যত তাড়াহুড়া করবে সে তত আগে ক্লান্ত হবে। শক্তির চেয়ে হেকমতের মূল্য এখানে বেশী। জমিনের খুঁটি কিনা!
৮। সিংহাসন তেমন উঁচু না হলেও সে আসনে বসে প্রায় সকলেই বাকী জমিনের তাবৎ মানুষকে লিলিপুট ভাবতে শুরু করে৷
৯। চূড়ায় উঠতে চাওয়ার দুর্নিবার আকাঙ্ক্ষা মানুষকে এতটা নির্বোধ তরে দেয় যে সে পায়ের নিচের মাটিশূন্যতাও আন্দাজ করতে পারেনা।
◼️ সমালোচনা
কিছু কিছু বইয়ের সমালোচনা করা একদমই উচিত না। সমালোচনা তাদেরকে মানায় না। ঝিলাম নদীর দেশ তেমনই একটি বই। তবে একটা বিষয় খুবই কনফিউজিং লেগেছে।
বইয়ের দশম অধ্যায়ে হযরতবাল মসজিদের বর্ণনায় হুট করেই আগ্রার তাজমহলের বর্ণনা কেমন করে চলে আসলো বুঝতে পারলাম না৷ এক পর্যায়ে মনে হলো, আমি কি এতোদিন ভুল জেনেছি? তবে কি
তাজমহল আগ্রায় নয় বরং কাশ্মীরে! তবে তাজমহলের ব্যাপারটি বাদ দিলে 'ঝিলাম নদীর দেশে' বইটি অতিচমৎকার একটি বই।
◼️ লেখক পরিচিতি
বুলবুল সরওয়ার ১৯৬২ সালের ২৭শে নভেম্বর গোপালগঞ্জে জন্মগ্রহন করেন। ৯ ভাই বোনের মধ্যে তিনি কনিষ্ঠ। লেখালিখির শুরু শৈশব থেকেই। উপন্যাস, গল্প, কবিতা, শিশুসাহিত্য, পত্রকথা, অনুবাদ সবমিলিয়ে তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ২৬। তবে ভ্রমণ বিষয়ে তার বিশেষ মুনশিয়ানা। তার লিখিত ভ্রমণ বিষয়ক বই 'মহাভারতের পথে' এবং 'ঝিলাম নদীর দেশ' বাংলা সাহিত্যের দুই অমূল্য সম্পদ৷ এই জনপ্রিয় লেখক বর্তমানে ভীষণ অসুস্থ৷ গত ২৮ অক্টোবর ২০১৮ তারিখ থেকে ইশকেমিক স্ট্রোকে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন আছেন৷ তার সুস্থতা কামনা করছি।
◼️ বই সম্পর্কিত তথ্য
বইয়ের নাম - ঝিলাম নদীর দেশ
লেখক - বুলবুল সরওয়ার
পৃষ্ঠা সংখ্যা - ১৯১
পারসোনাল রেটিং - ১০/১০
মুদ্রিত মূল্য - ২৫০ টাকা
আপনার মন্তব্য লিখুন