
চিঠি নিয়ে আলাপন
এক সময় চিঠিই ছিলো যোগাযোগের একমাত্র মাধ্যম। চিঠির মাধ্যমেই মানুষ একে অপরের সাথে যোগাযোগ রক্ষা করতো। চিঠির মাধ্যমেই মানুষ তার মনের ভাব প্রকাশ করতো। চিঠি ছিলো কখনও আনন্দের কখনও বেদনার। আবার কখনও প্রেমের কখনও বিচ্ছেদের। চিঠি বা পত্র হলো একজনের পক্ষ থেকে অন্যজনের জন্য লিখিত তথ্যধারক বার্তা। চিঠি দুজন বা দুপক্ষের মধ্যে যোগাযোগ বজায় রাখে; বন্ধু ও আত্মীয়দের সাথে সম্পর্ক আরো ঘনিষ্ট করে। পেশাদারি সম্পর্কের উন্নয়ন করে এবং আত্মপ্রকাশের সুযোগ দেয়। স্বাক্ষরতা টিকিয়ে রাখতেও একসময় চিঠির অবদান ছিল। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ চিঠির আদানপ্রদান করেছে, ইলিয়াডে তার উল্লেখ ছিল। হিরোডোটাস এবং থুসিডাইডিসের রচনাবলীতেও তা উল্লেখ করা হয়েছে।
ঐতিহাসিক ভাবে,চিঠির প্রচলন ছিল প্রাচীন ভারত,প্রাচীন রোম, মিশর এবং চীনে। এবং এখনো কিছুটা চলছে। সতের ও আঠারো শতকে চিঠি লেখা হতো স্ব-শিক্ষার জন্য। চিঠি ছিল পাঠচর্চা, অভিজ্ঞতা বর্ণনা করা, বিতর্কমূলক লেখা বা সমমনা অন্যদের সাথে আইডিয়া বিনিময়ের পদ্ধতি। কিছু লোক চিঠিকে মনে করতো কেবল লেখালেখি। আবার অন্যরা মনে করে যোগাযোগের মাধ্যম।বাইবেলের বেশ কয়েকটি পরিচ্ছেদ চিঠিতে লেখা। অযুক্তিগত, কূটনৈতিক বা বাণিজ্যিক- সবরকম চিঠিই পরবর্তীকালে ঐতিহাসিকগণ প্রাথমিক উৎস হিসেবে ব্যবহার করেন। কখনো বা চিঠি এতো শৈল্পিক রূপ পায় যে তা সাহিত্যের একটি বর্গ হয়ে ওঠে, যেমন বাইজেন্টাইনে এপিস্টোলোগ্রাফি বা সাহিত্যে তার প্রমাণ পাওয়া যায়।
সত্যি চিঠি নিয়ে হাজারও কথা লুকিয়ে আছে মনের মধ্যে। কোনটা রেখে কোনটা লিখি। একটা সময়ে চিঠি ছিলো একমাত্র যোগাযোগের মূল উৎস। কতো স্মৃতি,কতো গান কতো কবিতা, ছন্দ রচিত হয়েছে চিঠি নিয়ে। এই ডিজিটাল যুগে চিঠি প্রায় বিলুপ্তির পথে। মানুষ ভুলতে বসেছে চিঠির আদ্যোপান্ত নানা কথা। একসময় মানুষ পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখতো। একপাশে যার কাছে যাবে প্রাপকের ঠিকানা আর এক পাশে যে পাঠিয়েছে প্রেরকের ঠিকানা লিখে দিত। আর পোস্ট কার্ডের অপর পাশে প্রয়োজনীয় তথ্যাদি লিখে পাঠাতো। তখনকার সময়ে টাকার মূল্যছিলো অনেক বেশি। পোস্ট কার্ডে চিঠি লিখতে একটাকা খরচ হতো।
চিঠিতে যদি মানুষ আরও বেশি কিছু লিখতে চাইতো তাহলে হলুদ খাম ব্যবহার করতো। হলুদ খামের দাম ছিলো দুই টাকা। সেই চিঠিটা লিখতে ব্যবহার করতো নানা রকম কাগজ। কারও লেখা আাকা বাঁকা হয়ে যেত সে লিখতো দাগ টানা কাগজে। সেই চিঠিরও নানা ধরন ছিলো কোন চিঠি খুব দরকারী আবার কোন চিঠি প্রেমের হৃদয়ের সব কথা চিঠিতে সাজানো থাকতো। কোন চিঠি খুব তাড়াতাড়ি পৌঁছে যেত আবার কোন চিঠি মাসের পর মাস চলে যেত প্রাপকের হাতে পৌঁছাতো না। চিঠির যুগে অনেকের বাড়িতেই কাগজ কলম থাকতো না।
অনেকেই লিখতে পড়তে পারতো না। অন্যের বাড়ি থেকে কাগজ কলম ধার নিয়ে মানুষ চিঠি লিখতো। অন্যকে দিয়ে চিঠি লিখাতো। আবার একটা চিঠি আসলে আরেক জনের কাছে নিয়ে যেত চিঠিটা পড়ার জন্য। এক খানা চিঠি মানুষ অনেক বার পড়তো। পরিবারের কেউ একজন চিঠি পাঠালে দেখা যেত একজন চিঠিটা উচ্চস্বরে পড়ছে আর বাড়ির সবাই মিলে গোল হয়ে বসে শুনছে। কখনও দেখা যেত, ছেলে নতুন চাকরি নিয়ে অনেক দুরে চলে গিয়েছে। সেখান থেকে চিঠি লিখেছে সেই চিঠি পড়ে মায়ের চোখের জলে শাড়ির আঁচল ভিজে গিয়েছে। সেই চিঠিতে পরিবারের সকলের কথা লেখা থাকতো। বাড়ির কালো বিড়াল, লালু নামের কুকুরটা,ধলা গরু, রাম ছাগল, হাস মুরগি ক্ষেতের ফসলের কথা। পাড়ার শেফালী খালা, মদন কাকা, আজিজ স্যার আরও কতো জনের খবর জানতে চাইতো। সেই সময় চিঠি যেন এক বিশ্ময়কর অনুভূতিতে ভরপুর থাকতো।
এ রকম হাজারও চিঠি ছিলো মন কেমন করা। দেশের মধ্যে একটা চিঠি আসতে প্রায় এক সপ্তাহ লেগে যেত। সপ্তাহে ছয়দিন পোস্ট অফিস খোলা থাকতো। পোস্ট অফিসের সামনে ডাক বাক্স থাকতো সেই ডাক বাক্সের মধ্যে সবাই চিঠি ফেলে দিত। অনেক গুলো চিঠি জমা হলে ডাক বাক্সের তালা খুলে পোস্ট মাস্টার চিঠি গুলোর উপর সিল মারতো। তারপর চিঠি চলে যেত গ্রাম থেকে জেলার পোস্ট অফিসে ওখান থেকে প্রধান হেড অফিসে এভাবে চিঠি ঘুরেঘুরে ঢাকা চট্টগ্রাম,সিলেট, রাজশাহী,খুলনা, যশোর,বরিশাল নানান যায়গায় যেত। চিঠির উপর সিল দেখে বোঝা যেত এই চিঠি অনেক দুর থেকে এসেছে।
আবার অনেক সময় খুব জরুরী চিঠি গুলো তাড়াতাড়ি পৌঁছানোর জন্য চিঠি রেজিস্ট্রি করা হতো। সেই চিঠিতে খরচ পড়তো পাঁচ টাকা। রেজিস্ট্রি চিঠিতে অনেক গুলো ছোট ছোট ডাকটিকেট আর সিল বসিয়ে দিতো। রেজিস্ট্রি চিঠি মানেই ছিলো খুব জরুরী। হয়তো কারও অসুস্থতা কিংবা মৃত্যু সংবাদ নইলে অফিসিয়াল চাকরি বাকরি এমন অনেক গুরুত্বপূর্ন ইস্যু। পাড়ার সবাই জেনে যেত কার বাড়ি রেজিস্ট্রি চিঠি এসেছে। সেই খবর সকলে জানতে চাইতো।
ডাকপিয়নের সে কি ব্যস্ততা গ্রামের পর গ্রাম পায়ে হেঁটে হেঁটে কিংবা সাইকেলে করে চিঠি বিলি করে বেড়াতো। ডাকপিয়ন সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চিঠির ব্যাগ ঘাড়ে ঝুলিয়ে চিঠি পৌঁছে দিত পরম যত্নে। কারো ছেলের নতুন চাকরি হয়েছে টাকা পোস্ট অফিসে মানি অর্ডার করেছে। ডাক পিয়ন টাকা পৌঁছে দিতে গিয়েছে গ্রাহকের বাড়িতে, অনেকে খুশি হয়ে ডাক পিয়নের হাতে দশ পাঁচ টাকা ধরিয়ে দিয়েছে। এভাবেই কতো আনন্দ বেদনার খবর চিঠির মাধ্যমে লেনদেন হয়েছে। আবার অনেক সময় চিঠি প্রাপকের ঠিকানায় পৌঁছায় নাই। কতোদিন পেরিয়ে গেছে চিঠি পাঠিয়ে অপেক্ষা করছে কিন্তু মাঝ রাস্তা থেকে চিঠি হারিয়ে গিয়েছে। অবশেষে জানা গিয়েছে চিঠি মার গিয়েছে। এভাবেই কতো হাসি কান্নার খবর সারাজীবন অজানাই থেকে গিয়েছে।
আবার অনেকে টাকার অভাবে চিঠি পাঠাতে পারছে না। কোন রকম একটা চিঠি লিখে সাদা কাগজে মুড়ে ঠিকানা লিখে পাঠিয়ে দিত। যার কাছে যাবে সে টাকা দিয়ে চিঠি তুলে নেবে। এই চিঠিকে বলা হতো বিয়ারিং চিঠি। তারপর চিঠি যার কাছে যেত সেও অনেক সময় টাকার অভাবে চিঠি তুলতে পারছে না। এভাবে দিনের পর দিন চিঠিখানা পোস্ট অফিসে পড়ে থাকতো।
সেই যুগে যারা দেশের বাইরে যেত মানে বিদেশে সৌদি আরব,দুবাই , কাতার আমেরিকা এই রকম নানা দেশে। তখন বিদেশ থেকে চিঠি আসতে এক দেড়মাস সময় লাগতো।সুন্দর এয়ার মেইল খামে টিকেটের পর টিকেট সিলের পর সিল দেওয়া চিঠি আসতো। পাড়ার সব মানুষ জড়ো হতো সেই চিঠির খবর জানার জন্য। এইভাবে চিঠি বছরের পর বছর মানুষের সুখ দূঃখ আনন্দ বেদনার সঙ্গী হয়ে থাকতো।
একটা সময় বিয়ের কার্ড নিমন্ত্রণ পত্র সবই চিঠির মাধ্যমেই চলতো। এক দেড়মাস আগ থেকে মানুষ এই সব নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়ে দিতো। আবার অনেক সময় ঘটকের মাধ্যমে দুর থেকে পাত্রপক্ষ বিয়ের জন্য কন্যা দেখতে আসতো। এবং কন্যা দেখে বলে যেত চিঠি লিখে জানাবে।কন্যা পক্ষের লোক দিনের পর দিন সেই চিঠির জন্য অপেক্ষা করতো সেই চিঠি কখনও সুখের আবার দূঃখের সংবাদ বহন করতো।
কালের পরিক্রমায় চিঠি হারিয়ে গিয়েছে কিন্তু রেখে গিয়েছে অনেক স্মৃতি। কতো প্রেমের উপাখ্যান হয়ে আছে এই চিঠি। সেই সময়ে চিঠির অনেক যত্ন ছিলো। ভালোবাসার কথা প্রেমের কথা এক সময় মানুষ চিঠির মাধ্যমেই প্রকাশ করতো। অনেকে চিঠি লিখতো নানা রঙের কাগজে। তখন ভালোবাসার মানুষকে চমকে দিতে চিঠিটাকেই উপহার হিসেবে ব্যবহার করতো। কখনও গোলাপ ফুলের পাপড়ি দিয়ে, নইলে প্রজাতির ছবি এঁকে চিঠি লেনদেন হতো। কতো রকমের ছন্দ লিখে চিঠি লিখতো।
এভাবেই চিঠি বহন করেছে এমন কতো কতো আনন্দ বেদনার গল্প, গান কবিতা। আরো কতো কী? চিঠির যুগে মানুষ চিঠির গন্ধ নিত। সযত্নে রেখে দিত ট্রাংকে কিংবা সবচেয়ে নিরাপদ যায়গায়। প্রিয়জনের জন্য মন খারাপ হলে মানুষ দৌড়ে গিয়ে চিঠি পড়তো।
চিঠি ছিলো একমাত্র ভালোবাসার জীবন্ত মাধ্যম। সত্যিকার ভাবেই চিঠি যেন এক অভূতপূর্ব অভিজ্ঞতার স্বাক্ষর। আমার এখনও প্রতিদিন মনে হয় কেউ না কেউ আমাকে চিঠি লিখুক। আমি বারবার সেই চিঠিখানা পড়ি। যে কেউ তার সুখস্মৃতি কিংবা দূঃখ বেদনা ভরা হৃদয়ের সব কথা তাই লিখুক তবুও লিখুক। তাই সবাইকে বলতে চাই। হাজার ব্যস্ততার মাঝেও প্রিয়জন কে চিঠি উপহার দাও। মনের কথাটা লিখে পাঠাও।
চিঠি দিও নীল খামে
কিছুই লেখার নেই তবু লিখো একটি পাখির শিস।
একটি ফুলের ছোটো নাম,
টুকিটাকি হয়তো হারিয়ে গেছে কিছু, হয়তো পাওনি খুঁজে।
সেইসব চুপচাপ কোনো দুপুরবেলার গল্প,
খুব মেঘ করে এলে কখনো কখনো বড়ো একা লাগে, তাই লিখো।
করুণা করেও হলে চিঠি দিও।
চিঠি নিয়ে আরও কতো কথা রয়ে গেল মনে। স্মৃতির পাতায় যতোটুকু ছিলো তাই নিবেদন করলাম। সবশেষে গানের সুরে সুর মিলিয়ে বলে গেলাম.....
চিঠি দিও প্রতিদিন চিঠি দিও,
নইলে থাকতে পারবো না।
চিঠি গুলো অনেক বড় হবে,
পড়তে পড়তে সকাল দুপুর আর রাত্রি চলেই যাবে।
চিঠি দিও ....
আপনার মন্তব্য লিখুন