
শতবর্ষে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়: প্রাপ্তি, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ
‘প্রাচ্যের অক্সফোর্ড’ খ্যাত বাংলাদেশের প্রথম ও সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়-ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এ বছর শতবর্ষে পা দিলো। ১৯২১ সালে আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু করলেও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার আলোচনা শুরু হয় বঙ্গভঙ্গ রদের পর। ‘ঢাকা: স্মৃতি বিস্মৃতির নগরী’ বইয়ে অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন লিখেছেন, “ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল বঙ্গভঙ্গ রদের ক্ষতিপূরণ হিসেবে।“
১৯১২ সালের ২ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন ব্রিটিশ ভারতের ভাইসরয় লর্ড হার্ডিঞ্জ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। সে বছরই বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য গঠিত হয় ১৩ সদস্যবিশিষ্ট ‘নাথান কমিশন’। ১৯১৩ সালে এই কমিশন বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার ব্যাপারে ইতিবাচক প্রতিবেদন দিলেও প্রথম বিশ্বযুদ্ধের কারণে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার যাত্রা কিছুটা থমকে যায়। অবশেষে ১৯২০ সালের ১৩ মার্চ ভারতীয় আইনসভায় ‘দ্য ঢাকা ইউনিভার্সিটি অ্যাক্ট-১৯২০’ পাস হয় এবং ২৩ মার্চ গভর্নর জেনারেল এই বিলে সম্মতি প্রদান করেন। অবশেষে ১৯২১ সালের ১ জুলাই যাত্রা শুরু হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের।
শত বছরে দেশের এই শীর্ষ বিদ্যাপীঠের গৌরবের দিক অনেক। জ্ঞানচর্চা, গবেষণা, পাঠদানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূমিকা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের শ্রেষ্ঠ শিক্ষাবিদ, দার্শনিক, বিজ্ঞানী, সাহিত্যিকদের বড় অংশ এই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েছেন, পড়িয়েছেন। তৎকালীন পূর্ববঙ্গ ও পূর্ব পাকিস্তান এবং বর্তমান বাংলাদেশের প্রশাসন, স্বাধীন পেশাজীবী, রাজনীতিবিদ—অধিকাংশই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী।
উচ্চশিক্ষার পাশাপাশি দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনেও গৌরবময় ভূমিকা রয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করেছেন, তন্মধ্যে রয়েছেন ১৩ জন রাষ্ট্রপতি, ৭ জন প্রধানমন্ত্রী এবং একজন নোবেল পুরস্কার বিজয়ী। বাংলাদেশের জাতির জনক শেখ মুজিবুর রহমান এখানে পড়াশোনা করেছেন।
১৯৪৮ সালের ২৪ মার্চ যখন মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ কার্জন হল প্রাঙ্গণে উর্দুকে রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেন, “Urdu and only Urdu shall be the state language of Pakistan”। তখনই ছাত্ররা “না, না” বলে এর বিরোধিতা করেন। পরবর্তীতে এই বিশ্ববিদ্যালয়ের বলিষ্ঠ ভূমিকার কারণে ১৯৫২ সালে ভাষা আন্দোলনের মধ্য দিয়েই আমরা ভাষার দাবি সুপ্রতিষ্ঠিত করতে পারি। এছাড়াও ৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬ এর ছয় দফা, ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থান, ৭০ এর নির্বাচন এবং মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে বাংলাদেশ গঠনে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ১৯৭১ সালের ২ মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই সর্বপ্রথম বাংলাদেশের পতাকা উত্তোলন করা হয়। মুক্তিযুদ্ধের সময় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সবাই প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণ করে। স্বাধীনতার আগে যেমন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আন্দোলন-সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছিল, স্বাধীনতার পরেও দেশের গুরুত্বপূর্ণ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে এই বিশ্ববিদ্যালয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৯০ এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন ও ২০১৩ সালে যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের দাবিতে আন্দোলনের কথা বলা যেতে পারে।
তিনটি অনুষদ, ১২টি বিভাগ, ৬০ শিক্ষক, ৮৪৭ শিক্ষার্থী এবং তিনটি আবাসিক হল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ের কলেবর ও পরিসর অনেক বড়। ১৩টি অনুষদ, ৮৪টি বিভাগ, ১৩টি ইনস্টিটিউট, ৫৬টি গবেষণাকেন্দ্র, ১৯৮৬ জন শিক্ষক, প্রায় ৪৭ হাজার শিক্ষার্থী এবং ১৯টি আবাসিক হল ও ৪টি হোস্টেল নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়টিকে দেশের শিক্ষাব্যবস্থার প্রণকেন্দ্র বললেও ভুল হবে না। এখনো যে কোনো অসঙ্গতিতে আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। সরকারি আমলা ও নীতি নির্ধারকদের একটি বড় অংশের যোগান দেয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়। বিশ্বের অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের সাথে প্রতিযোগিতা করার সক্ষমতা আছে বিশ্ববিদ্যালয়টির। পহেলা বৈশাখ থেকে শুরু করে যে কোনো উৎসব পার্বনের কেন্দ্রস্থল হিসেবে বিবেচিত হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়।
তবে সাবেক ও বর্তমান শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন হলো, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও পাঠদানের মানে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রত্যাশিত উন্নতি হয়নি। আইন অনুযায়ী ‘স্বায়ত্তশাসিত’ হলেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় মূলত দলীয় রাজনীতির নিয়ন্ত্রণেই পরিচালিত হয়। শিক্ষক ও ছাত্ররাজনীতি এখন দলীয় লেজুড়বৃত্তির দোষে দুষ্ট। উপাচার্য পদে নিয়োগ হয় সরকারের পছন্দে। বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন পদে নিয়োগ হয় সরকারপন্থী শিক্ষক সংগঠনের অনুগতদের। বিভাগ, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেড়েছে, বিপরীতে মানের দিক দিয়ে অবনমন ঘটেছে। শিক্ষক নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এসেছে বহুবার।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষের সংকট প্রবল। আবাসনসংকট প্রবল। খাবারের মান নিম্ন। হল নিয়ন্ত্রণ করে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্রসংগঠন। তাদের হাতে শিক্ষার্থীদের নিগৃহীত হওয়ার অভিযোগ বহু বছরের। কিন্তু সেগুলোর সমাধান নেই, উদ্যোগও তেমন একটা চোখে পড়ে না।
মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ উদযাপনের বিরল সৌভাগ্য-প্রাপ্তির ক্ষণে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণার মান আরও উন্নত হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
আপনার মন্তব্য লিখুন