অস্তিত্ব সংকটে ছাত্র রাজনীতি; কিন্তু কেন?


অস্তিত্ব সংকটে ছাত্র রাজনীতি; কিন্তু কেন?

১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর দীর্ঘ নয় মাস মহান  মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জিত হয়। স্বাধীনতা যুদ্ধের অনুপ্রেরণা হিসেবে '৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, '৬২ এর শিক্ষানীতির বিরুদ্ধে আন্দোলন,'৬৬ সালের ছয় দফা,'৬৯ সালের গণ-অভ্যুত্থানের মতো আরো অনেক আন্দোলন সংগ্রাম সংঘটিত হয় তৎকালীন পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে। আর এসব আন্দোলন-সংগ্রামে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন তৎকালীন ছাত্র সমাজ।শুধু তাই নয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতার মহান স্থপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এর রাজনৈতিক জীবনের সূচনা ঘটে কলকাতা ইসলামীয়া কলেজের ছাত্র থাকাকালীন সময়ে।এমনকি বর্তমান দেশবরেণ্য রাজনীতিবিদ, বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী, আওয়ামীলীগ সভাপতি শেখ হাসিনা সহ আওয়ামীলীগের জাহাঙ্গীর কবির নানক,সাবেক কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরী, আওয়ামীলীগের বর্ষীয়ান নেতা তোফায়েল এবং বিএনপি নেতা রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান,শামসুজ্জামান দুদু, ঐক্যফ্রন্টের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্নাসহ আরো অনেক প্রবীন রাজনীতিবিদরা এই ছাত্র রাজনীতির মাধ্যমেই বর্তমানে জাতীয় নেতা হিসেবে দেশব্যাপী পরিচিত।

 

বাঙালী জাতিকে বাংলা ভাষার অধিকার ফিরিয়ে দিতে গিয়ে ১৯৫২ সালে শহীদ হন তরুণ ছাত্র সালাম,রফিক,শফিক,জব্বারসহ আরো অনেকেই। এভাবেই '৬৯ এর স্বৈর শাষন বিরোধী  গণ-অভ্যুত্থানের সময় তরুন ছাত্র নূর হোসেন শহীদ হন।আন্দোলনের এই ধারাবাহিকতায় ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে মুক্তিবাহিনীর একটা বিরাট অংশ ছাত্র সমাজ নিয়েই গঠিত হয়েছিল। অর্থাৎ বাংলাদেশ সৃষ্টির সূচনা থেকেই ছাত্র সমাজ এদেশের রাজনৈতিক আন্দোলন সংগ্রামে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত। 

সেই ছাত্র রাজনীতির ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য স্বাধীনতার পর দেশের চারটি প্রধান স্বায়ত্তশাসিত বিশ্ববিদ্যালয় অর্থাত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়,জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় এবং চট্রগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠা করা হয়।শুধু বিশ্ববিদ্যালয় নয় দেশের মফস্বল এলাকায় অবস্থিত ডিগ্রি ও অনার্স কলেজগুলোতেও ছাত্র সংসদ প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতির চর্চাকে ধরে রাখার প্রয়াস চলতে থাকে।স্বাধীনতার পরে বিভিন্ন সময়ে আরো অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয় এবং কোনটিতে ছাত্র সংসদের বিধান রাখা হয়,আবার কোনটিতে রাখা হয় না।

 

পরবর্তীতে দেশের শাসন ক্ষমতায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের বিভিন্ন সময়ে অবতারণা হয় এবং সেসব রাজনৈতিক দলগুলোর নিজস্ব ছাত্র সংগঠন গড়ে উঠে।বাংলাদেশের দুটি প্রধান রাজনৈতিল দল আওয়ামীলীগ ও বিএনপি স্বাধীনতা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় বিভিন্ন সময়ে আবির্ভূত হয়।এছাড়াও জাতীয় পার্টিসহ বিভিন্ন সামরিক সরকার রাষ্ট্র ক্ষমতায় আসে।আর দুটি প্রধান রাজনৈতিক দল অর্থাৎ আওয়ামীলীগ ও বিএনপি'র ছাত্র সংগঠন হিসেবে যথাক্রমে ছাত্রলীগ ও ছাত্রদলের সৃষ্টি হয়।এছাড়াও পরবর্তী সময়ে ছাত্রশিবির,ছাত্র ইউনিয়ন, ছাত্রফ্রন্ট,ছাত্রমৈত্রীসহ নানা ছাত্র সংগঠন সৃষ্টি হতে থাকে। তখন সাধারণ ছাত্র সংগঠন ও রাজনৈতিক দলের ছাত্র সংগঠনগুলোর মাঝে প্রতিযোগিতার মধ্য দিয়ে ছাত্র সংসদ চলতে থাকে।

 

কিন্তু একসময়  নানা অজানা কারনে ছাত্র সংসদ নির্বাচন বন্ধ করার মাধ্যমে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রয়াসকে গলা টিপে হত্যা করা হয়।অর্থাৎ '৯০ এর দশকে  এরশাদ সরকারের আমলে সর্বশেষ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ(ডাকসু) নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও  সর্বশেষ ২০১৯ সালে নানা চড়াই- উৎরাই পেরিয়ে দীর্ঘ ২৭ বছর পর আওয়ামীলীগ সরকারের অধীনে ডাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়।কিন্তু অন্যসব বিশ্ববিদ্যালয় এবং কলেজ গুলোর ছাত্র সংসদ নির্বাচন আজ অবধি অনুষ্ঠিত হয়নি।শুধু তাই নয় সাম্প্রতিক সময়ে রাজনৈতিক দল সমর্থিত ছাত্রসংগঠনগুলোর বিভিন্ন অপকর্মের কারনে অনেক বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে একে একে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষিত হচ্ছে যা এই দেশের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রধান অন্তরায় এবং  সুশীল সমাজ ও সাবেক  ছাত্র নেতাদের সমর্থন বহির্ভূত সিদ্ধান্ত।  

 

আবার,এই ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার কারন এবং ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধের কারন সম্পর্কে বিশ্লেষণ করলে আজকের এই ছাত্র  রাজনীতির জীর্নদশাই কথা বলতে শুরু করবে।

 

ছাত্র সংসদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়ার পেছনে প্রধানত দুটি কারনকেই দায়ী করা হয়।এক;বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলগুলোর ছাত্র সংগঠনের নির্বাচনে ভরাডুবির আশঙ্কা;দুই; বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অনীহা এবং অসহযোগিতা। 

এই দুটি কথার পেছনে যথেষ্ট যৌক্তিকতা রয়েছে। 

প্রথম কারনটির বিশ্লেষণ করলে আওয়ামীলীগ,বিএনপিসহ বিভিন্ন  রাজনৈতিক দলের  ছাত্রসংগঠনগুলোর পূর্বের এবং বর্তমান অপকর্মগুলোর দিকে নজর দিলেই স্পষ্ট ধারণা পাওয়া যাবে। 

২০০২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শামসুন্নাহার হলে সাধারণ শিক্ষার্থীদের দাবী আদায় আন্দোলনে তৎকালীন সমর্থিত ছাত্রদল পুলিশের সাথে সম্মিলিতভাবে রাতের অন্ধকারে সাধারণ শিক্ষার্থীদের উপর হামলা করে। এছাড়াও ভিন্ন মতাবলম্বী শিক্ষার্থী ছাত্রলীগ কর্মী বুয়েটের সানি হত্যাসহ ক্ষমতাসীন সরকারের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য  নানা ধরনের অপকর্মে লিপ্ত থাকে।জামায়ত সমর্থিত ছাত্রশিবিরের নামেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীর পায়ের রগকাটা সহ বিভিন্ন অভিযোগ রয়েছে।আবার আওয়ামীলীগের ছাত্র সংগঠন ছাত্রলীগের বিভিন্ন নেতা- কর্মীদের বিরুদ্ধেও সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু অপকর্মের চিত্র উঠে এসেছে।যার মধ্যে ২০১৯ সালের বুয়েটের শিক্ষার্থী আবরার ফাহাদ হত্যা।অতি সাম্প্রতিক সময়ে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষকের মৃত্যুর দায়ে ক্যাম্পাসের ছাত্রলীগের নেতা কর্মীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ এবং চার জন শিক্ষার্থীকে আজীবনের জন্য বহিষ্কার যারা প্রত্যেকেই ছাত্রলীগের কর্মী।

দ্বিতীয় কারনটির বিশ্লেষণে রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা।বিগত কয়েক বছর ধরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যসহ প্রশাসনের বিরুদ্ধে মোটা অঙ্কের দূর্নীতির অভিযোগ উঠেছে।এছাড়াও দায়িত্বে অবহেলাসহ নানা অনিয়মের কথা।এমনকি এসব ঘটনার জন্য শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের মুখে অনেকেই পদত্যাগ করতেও বাধ্য হয়েছেন।এসব আন্দোলনগুলোতে ছাত্র সংসদের প্রতিনিধিত্ব সৃষ্টি হলে আন্দোলন আরো বেগবান হওয়ার সম্ভাবনা থাকতো।আর এজন্যই হয়তো বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনগুলোও ছাত্র সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠানে অনীহা প্রকাশ করে।গত কয়েকদিন আগে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এক হল প্রাধ্যক্ষের বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের এক পর্যায়ে ক্যাম্পাসের ক্লাস-পরীক্ষা অনির্দিষ্টকালের জন্য স্থগিত করেছে প্রশাসন।

 

এভাবে ক্রমবর্ধমানভাবে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল সমর্থিত ছাত্র সংগঠনগুলোর অপকর্মের অজুহাতে এবং বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের ছাত্র রাজনীতিকে ক্যাম্পাসের অস্থিরতার কারন মনে করে  বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসগুলোতে ছাত্র রাজনীতি বন্ধের পায়তারা চলছে এবং ইতোমধ্যে বাংলাদেশ প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র রাজনীতি নিষিদ্ধ ঘোষণাও করা হয়েছে। আরও কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাজনীতি নিষিদ্ধ করার সুপারিশ করা হয়েছে। 

এমন সিদ্ধান্তের ফলে হিতে বিপরীত হবে।একদিকে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বেচ্ছাচারিতা বাড়বে অপরদিকে জাতিকে নেতৃত্ব শূন্য করার প্রচেষ্টা চলবে।তাই ছাত্র রাজনীতি বন্ধ না করে অপরাজনীতি বন্ধ করে এবং ছাত্র সংগঠনগুলোর গঠনতন্ত্রের পরিবর্তন ঘটিয়ে গনতান্ত্রিক পন্থায়  নিয়মিত ছাত্র সংসদ নির্বাচন আয়োজনের মাধ্যমে দেশকে ভবিষ্যতে পরিচালনার জন্য যোগ্যতাসম্পন্ন নেতৃত্ব তৈরির মাধ্যমে ছাত্র রাজনীতিকে বাঁচিয়ে রাখা এবং স্বার্থক করা এখন সময়ের দাবি।

 

শাহ জাহান 

শিক্ষার্থী 

ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া 

ই-মেইল:[email protected]

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন