
খোয়াব
- শামসু! তর হিম্মত দেইখা আমি তব্দা খাইয়া গেলাম!
- হিম্মতের কি দেখলেন-মিয়া ভাই?
- করস রিক্সার ড্রাইভারি, ভাব ধরস পাইলটের।
তরে আদর ছোহাগ কইরা বাসায় ডাইকা পাঠাইলাম। ছামনে ঈদ শাড়ি, লুঙ্গি, মাসের বাজার, মশলা, কিছু নগদ ট্যাকা দিমু মনে করচি।
তুই যে ভাব ধরলি-তর উপরে মন উইঠা গেছে।
- মিয়া ভাই! যার উপরে মন উইঠা যায়-তারে দান দক্ষিণা না দেয়াই উত্তম।
- শামসু! মুখে মুখে তর্ক করবিনা,তর্ক করস ক্যা?তর্ক করস ক্যা?
- আসি মিয়া ভাই! রিক্সার জমা উঠান লাগব, আসসালামু আলাইকুম।
শামসু মিয়া রিক্সার পেডালে পা তুলে দিয়ে নিমিষেই গলিপথ থেকে বড় রাস্তায় ভীড়ের মধ্যে মিলিয়ে গেল।
অনেক দিন ধরেই লাল চাঁন্দ হাজির রাতে ভাল ঘুম হয় না। আজ রাতে তিনি মসজিদে খতম তারাবিহও পড়তে গেলেন না। শরীরটা কেমন গরম গরম লাগছে।
এই গরম এই শীত!কোন মতে এশার নামাজ পড়েই বিছানায় চলে গেলেন।
গায়ে পাতলা একটা কম্বল টেনে নিয়ে ফ্যান মুডে এসি চালিয়ে শুয়ে পড়লেন লাল চান্দ হাজি। তার ঘুম এসে গেলে সেহেরীর আগে তাকে ডাকতে নিষেধ করে দিলেন।
লাল চান্দ হাজি গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলেন…!
ঘুমের মধ্যে নাক ডাকা হাজি সাহেবের বহু পুরানা অভ্যাস। তিনি মোটামুটি চার ঘোড়া মটরের মত শব্দ করে নাক ডাকছেন!
হঠাৎ হাজি সাহেবের শিয়রের কাছে কেউ একজন এসে বসল মনে হল।
- আরে শামসু তুই?
জানি, জানি! না আইসা যাবি কই বাপধন?
অতগুলো বাজার সদাই, দুইখান শাড়ি,
দুইখান লুঙ্গি, নগদ পাঁচশ ট্যাকা! খুব তো রাস্তায় মাইনষের ছামনে চ্যাটাং চ্যাটাং কথা শুনায়ে দিলি! সেই তো আসতেই হইলো।
- লাল চান্দ! ভাল করে দেখ তো! আমারে কি শামসুর মত লাগে?
- না তো! লাল চান্দ ঘাড় ঘুরিয়ে দেখেন।
- আপনে কে জনাব?
- আমি মানুষের কাছে তার সমগ্র জীবনে একবার মাত্র আসি এবং খালি হাতে ফেরত যাই না!
- আপনে কি তবে…?
লালচান্দ হাজি তোতলাতে শুরু করলেন।
- কোন অসুবিধা নাই মাননীয়।আপনাকে খালি হাতে যেতে হবে না।
আমার গোডাউন ভরতি যাকাতের শাড়ি, লুঙ্গি আপনার যত খুশি নিবেন।
- পাগল! ওসব দিয়ে আমি কি করব?
- টনকে টন চাল, ডাল, তেল, পিঁয়াজ মজুত আছে; যত খুশি নেন, নেন না।
- উঁহু!
- তবে আপনেরে কি দিয়া সন্তুষ্ট করা পারি মাননীয়?
- আমাকে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা রাব্বু'ল আ'আলামীন কোন মানুষকে দেন নাই।
আমার মহামুনীব যার উপর খুশি, আমিও তার উপর খুশি।
- জনাব আমার মুনীব কি আমার উপর খুশি না অখুশি?
শিয়রে বসা আগন্তুক খন খন করে হেসে ওঠলেন!
- দোহাই আল্লাহর,আপনে অমন কইরা হাইসেন না!আমার ডর করে!
লাল চান্দ রীতিমত ঘামছেন। এসির মধ্যেও ঘামছেন।
- লাল চান্দ!
- জি জনাব!
- হক্বকুল ইবাদ কারে কয় জানা আছে?
- জি মাননীয়! বান্দার হক্ব বা অধিকার।
- সেই হক্ব আপনি কোনদিন খেয়ানত করেছেন বলে আপনার মনে পড়ে?
হাজি মুহাম্মদ লাল চান্দ চুপ করে আছেন। তার গাল বেয়ে চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে। একে একে তার সব মনে পড়ছে!
তিনি আর তার ভাই মিলে আপন দুই বোনকে লাওয়ারিশ করেছেন।
এক সময় প্রথম শ্রেণির সরকারি ঠিকাদার ছিলেন। উপর মহলের সাথে আঁতাত করে টেন্ডারে পাওয়া সরকারি রাস্তা সংস্কার না করেই কোটি টাকা বিল তুলে নিয়েছেন।
পাটুয়াটুলীতে এক নিঃসঙ্গ বিধবার মার্কেট দখল করেছেন।
নয়া বাজারে তার পাইকারি রডের দোকান থেকে সারা বছর মানুষকে রড ওজনে কম দিয়েছেন।
সারা জীবনের পাপের কামাই তিনি তার দুই ছেলেকে সমান ভাগে ভাগ করে দিয়েছেন।
প্রতি রমজানে অত্যাবশ্যকীয় পণ্য মজুত করে অবৈধ মুনাফা অর্জন করেছেন।
এ পর্যন্ত পাঁচবার হজ্জ্ব করেছেন।
এ সবই বান্দার হক্ব মেরে করা!
- হাজি সাহেব চুপ করে আছেন যে?
পাঁচবার হজ্জ্ব করলেন অথচ যাকাত দেয়ার বিধানটাই জানেন না? যাকাত আপনার ধনে গরীবের অধিকার।
সাহেব-এ নিছাব নিজ উদ্যোগে দরিদ্রকে যাকাত পৌঁছে দিবে, ওই পরিমাণ অর্থের পুর্ণ মালিকানা দিয়ে দ্রুত তার মাল পরিশুদ্ধ করে নিবে এটাই আল্লাহর হুকুম। যাকাত কোনো ভিক্ষা বা সাদাকাহ না!
যাকাত হিসাবে শাড়ি, লুঙ্গি দেয়া আপনাদের কে শিখিয়েছে?
আপনি যখন আরাফার ময়দানে "লাব্বাইকা আল্লাহুম্মা লাব্বায়েক" তাকবির দেন; আল্লাহ তখন আপনার মত পাপীর হাজিরা গ্রহণ করেন না!
তিনি বলতে থাকেন, "লা লাব্বায়েক ইয়া আবদাল্লাহ!"
আমার মালিক আমাকে হুকুম করেছেন আপনাকে তার সান্নিধ্যে পৌঁছে দিতে।
দয়া করে চক্ষু বন্ধ করুন, আমার কাজ আমাকে করতে দিন।
লাল চান্দ হাজি ক্রমাগত হাত পা ছুঁড়তে লাগলেন, পাগলের মত প্রলাপ বকতে লাগলেন! তার পরনের লুঙ্গি স্থানচ্যুত হয়ে গলায় আটকে গেল; সে এক বিচ্ছিরি ব্যাপার।
কোরবানির পশুর মত গোঁ গোঁ শব্দ করতে করতে তিনি জেগে ওঠলেন।
তার গা ভিজে জবজবে!তিনি প্রচন্ড ভয় পেয়ে গেছেন!
আজরাইল ফেরেশতার ভয়ংকর রূপ তিনি দেখেছেন। একদলা থুথু বুকে ফুঁকে লাল চান্দ হাজি বিড়বিড় করে বলছেন-
"লা ইলাহা ইল্লা আন্তা সোবহানাকা ইন্নি কুন্তু মিনাজ্জ্বোয়ালিমিন।"
তিনি কোন মতে সেহেরী খেলেন। তার গলা দিয়ে খাবার নামে না। মালাকুল মউতের চেহারা এত ভয়ংকর? কারো কারো জন্য নাকি খুবই হাসিখুশি সুরতে এসে দেখা দেন! নিশ্চয়ই তারা পূণ্যবান বান্দা। লাল চান্দ হাজি পূণ্যবান নন এটা তিনি বেশ বুঝতে পারেন।
ফজর পড়ে তিনি ঝিম মেরে বসে রইলেন অনেকটা সময়।
আকাশ পরিষ্কার হলে লাল চান্দ হাজি তার সিন্দুক খুলে পাটুয়াটুলীর দখল করা মার্কেটের জাল দলিল খানি বের করলেন। বগলদাবা করে দলিল খানি নিয়ে বিধবা কুলসুম বেওয়ার দরজার কড়া নাড়তে লাগলেন।
- মরিয়মের মা!মরিয়মের মা!
- ক্যাঠা লালে?
- হ গো, চাচী হ।
- এত ছকালে? আবার কি মতলব?
লাল চান্দ হাজি শিশুর মত ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগলেন।
- এই লন চাচী আপনের ছামনেই মার্কেটের জাল দলিল আমি ছিঁড়া ফালাইলাম!আমারে মাফ কইরা দেন চাচী।
আমি গুনাহ করচি, কবিরা গুনাহ।
- মাথা ঠিক আছে তো?
- চাচী আগে মাথা ঠিক আছিল না;অহন
আছে। আমি যাই আমার অনেক কাম পইড়া আছে।
কুলসুম বেওয়া বোকার মত ফ্যালফ্যাল করে লালের গমন পথের দিকে চেয়ে রইলেন।
লাল চান্দ হাজি লিস্ট ধরে ধরে বাড়ি বাড়ি গিয়ে যাকাতের নগদ অর্থ পৌঁছে দিচ্ছেন! সবাই হাজি লাল চান্দের আচরণে বিস্মিত।
ব্যাংক একাউন্ট প্রায় ফাঁকা করে দিয়ে সরকারি ট্রেজারিতে রাস্তার টাকা জমা দিয়ে দিলেন।
মোটামুটি দুপুরের মধ্যেই পাটুয়াটুলী, প্যারিদাস রোড, ইসলামপুর মার্কেট এলাকায় চাউর হয়ে গেল; আলী হাজী, আর ওলী হাজীর বাবা মুহাম্মদ লাল চান্দ হাজি পাগল হয়ে গেছেন!
তার দুই পুত্র তাকে শিকলে বেঁধে রেখেছে। সারাক্ষণ ঝিম মেরে বসে একা একা কি যেন ভাবেন লাল চান্দ। পুত্র কিংবা পুত্রবধুরা খাবার দিতে গেলে বলেন,
- খামু না!
- বাবা খাইয়া লও নইলে শইল খারাপ করব।
- আগে ক' তগো দুই ফুফুরে একটা বাড়ি লেইখা দিবি?
আলী আর ওলী এ ওর মুখ চাওয়াচাওয়ি করে! আলীর কানে ওলী ফিসফিস করে বলে,
- ভাই আব্বারে তাড়াতাড়ি পাবনা মেন্টাল হসপিটালে ভর্তির ব্যবস্থা করেন! বাইরে থাকলে আমাগো ফকির বানায়া ছাড়ব!
প্যারিদাস রোডের বাড়ির সিড়ির নিচে হাজি লাল চান্দের কালো কুকুরটা করুণ সুরে ক্রমাগত কেঁদেই যাচ্ছে। অবলা প্রাণিটা কিছু টের পেল কিনা কে জানে!
আপনার মন্তব্য লিখুন