জীবন ও কৃষি


প্রচণ্ড তাপদাহের পর মুষলধারায় বৃষ্টি জনজীবনে শান্তি ও স্বস্তি এনে দেয়। সবাই যেন হাঁফ ছেড়ে বাঁচে। কিন্তু সেই শান্তির, স্বস্তির বৃষ্টি যে কারো জন্য ক্ষতির কারণ হতে পারে তা কি আমরা জানি? অবশ্যই জানি। কিন্তু তা নিয়ে ভাবতে আমরা নারাজ। বৃষ্টি দেখতে দেখতে জমিয়ে খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা খাওয়ার সময় অন্যের লাভ ক্ষতি নিয়ে আমি কেন চিন্তা করবো! যার চিন্তা সে করুক। কিন্তু চিন্তা না করলে যে ক্ষতি আমাদেরও হবে তা আমরা বুঝতে পারি না। 


আমাদের দেশ কৃষিপ্রধান। শুধু যাঁরা কৃষি কাজ করে তারাই নয়, বরং দেশের সর্বস্তরের মানুষ (প্রধানমন্ত্রী থেকে দিনমজুর, কোটিপতি থেকে ভিখিরি) সবাই এই কৃষির ওপরে নির্ভরশীল। আর কৃষির জন্য বৃষ্টি ভীষণভাবে জরুরী। পরিমিত বৃষ্টির পানি যেমন জমির মাটিকে উর্বর করে। তেমনি আবার অতিরিক্ত বৃষ্টিতে দেখা দেয় জলাবদ্ধতা, বন্যা। তাই বৃষ্টি দেখলেই অন্যান্য সাধারণ মানুষের মতো কৃষকেরা খুশি হতে পারে না।


হঠাৎ আকাশ কালো করে মেঘ করলো। সুশীতল ভেজা বাতাস বইতে শুরু করলো। তা দেখে সবাই ভীষণ আনন্দিত। কিন্তু একজন কৃষক সেই মুহূর্তে আনন্দিত হতে পারে না। কৃষকের মনে তখন অন্য মেঘ জমতে শুরু করে। তা হলো ভয় আর আশঙ্কার মেঘ। যদি ঝড়ো বাতাস হয়? যদি ফসল হেলে পড়ে? যদি অনেক বেশি বৃষ্টি হয়? যদি ফসল বৃষ্টির পানিতে তলিয়ে যায়? যদি শিলাবৃষ্টি হয়? যদি শিলার আঘাতে ফসল ঝরে যায়? যদি, যদি, যদি... 


এমন অনেক যদি এসে ভিড় করে কৃষাণ-কৃষাণীর মনে। কারণ, ফসলের ক্ষতি হলে ফলন কম হবে। ফলন কম হওয়ার মানে তাদের আগামী মৌসুম পর্যন্ত কষ্টে দিন কাটাতে হবে। মিলবে না উপযুক্ত ফসলের মূল্য। কৃষাণী পাবে না নতুন শাড়ি, তাঁদের সন্তান পাবে না সঠিক পুষ্টি, উপযুক্ত শিক্ষা। পেট ভরে দু'বেলা ভাত পাবে না তারা। 


আবার বৃষ্টি যদি না হয়, তাহলেও কৃষকের ক্ষতি। বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির যুগে খরায় আর ফসল শুকিয়ে মরে না ঠিকই, কিন্তু কৃষককে গুনতে হয় অতিরিক্ত খরচা। দীর্ঘদিন অনাবৃষ্টি হলে কৃষক ভাবনায় পড়ে যায়। অনাবৃষ্টিতে ফসলের ক্ষতির পরিমানটা অতিবৃষ্টির তুলনায় কিছুটা কম হলেও, ক্ষতি কিন্তু আছে। বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষককে সম্পূর্ণভাবে সেচনির্ভর হয়ে পরতে হয়। ডিজেল-চালিত পাম্প হোক বা বিদ্যুৎ চালিত পাম্প, খরচা হয় দুইটাতেই। বৃদ্ধি পায় উৎপাদন খরচ। উৎপাদন খরচ বেশি হওয়ায় ফসলের দাম বৃদ্ধির আশায় থাকে কৃষকেরা। আশানুরূপ দাম পাওয়ার জন্য ফসল বিক্রি করতে বিলম্ব করে। যতটাও ফসল বিক্রি করে সেই অর্থের প্রায় পুরোটাই চলে যায় সেচ এবং সার, কীটনাশকের মূল্য পরিশোধ করতে। নিজেরা অভাব অনটনে দিন কাটাতে থাকে। আর একবার ফসলের দাম বৃদ্ধি পেলে কৃষকেরা ফসল বেচে স্বাচ্ছন্দ্যে দিন কাটাতে পারে। 


এসব তো গেল কৃষকদের সুবিধা অসুবিধা। শুরুতে বলেছিলাম কৃষির ওপরে আমরা সবাই নির্ভরশীল। কিন্তু কীভাবে? আর কতটা? এই বিষয়টা বোঝার জন্য আমাদের বিশেষ ভাবনা চিন্তার প্রয়োজন কিন্তু পড়ে না। 


কৃষক ছাড়া অন্য সকলকে (ব্যবসায়ী হোক বা চাকুরীজীবী) চাল, ডাল, সবজি কিনে নিজের খাবারের যোগান দিতে হয়। যখন ঝড়, শিলাবৃষ্টি, খরা বা বন্যায় ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়, তখন দেশে এসবের উৎপাদন পরিমাণ কমে যায়। চাহিদা অনুযায়ী বাজারে চাল ডালের যোগান থাকে না। আবার ভবিষ্যতে মূল্যবৃদ্ধি ও অতিরিক্ত লাভের আশায় অনেক ব্যবসায়ী চাল ডালের মজুদ করে রাখে। ফলে আমদানি করতে হয় চাল থেকে পেঁয়াজ সবকিছু। আর ফল হিসেবে সাধারণ ক্রেতাকে গুণতে হয় অতিরিক্ত মূল্য। 


আবার যখন দেশে যথেষ্ট ফসল ফলে, ফসলের ক্ষতি কম হয় এবং কৃষকেরা ফসলের আশানুরূপ দাম পায় তখন দেশের বাজারে ফসলের যথেষ্ট মজুদ থাকে। থাকে চাহিদামত যোগানও। বাইরে থেকে আমদানি করার প্রয়োজন হয় না। বাজারমূল্য থাকে ক্রেতার হাতের নাগালে। 


বৃষ্টি হোক বা খরা, দেশের কৃষির ওপরে তার ব্যপক প্রভাব পরে। আর আমরা দেশের সকলেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে কৃষির দ্বারাই জীবন নির্বাহ করছি।

আপনার মন্তব্য লিখুন

আর্টিকেল খুঁজুন